‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন এবং ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির টালবাহানার তীব্র সমালোচনা করেছেন প্রখ্যাত আলোকচিত্রী, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী ড. শহিদুল আলম। তিনি বর্তমান সরকারের প্রতি সোজাসাপ্টা প্রশ্ন রেখে বলেছেন, জনগণ যে রায়ের ভিত্তিতে বিএনপিকে ক্ষমতায় বসিয়েছে, সরকার যদি সেই রায় সানন্দে গ্রহণ করতে পারে, তবে গণভোটের রায় মেনে নিতে তাদের এত অনীহা কেন?
আজ রোববার (২৯ মার্চ) দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে আয়োজিত এক মানববন্ধনে তিনি এই মন্তব্য করেন। ‘গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরাম’ নামের একটি অরাজনৈতিক নাগরিক সংগঠন এই কর্মসূচির আয়োজন করে।
মানববন্ধনে ড. শহিদুল আলম বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপিকে তাদের ক্ষমতায় আসার পেছনের প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ রক্ত দিয়ে প্রমাণ করেছে যে তারা একটি ভিন্ন ও সংস্কারকৃত বাংলাদেশ চায়। সরকার বর্তমানে যে গদিতে বসে আছে, তা জনগণেরই দেওয়া রায়। সরকারের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার জনরায়টি যদি আপনারা সহজেই গ্রহণ করতে পারেন, তবে সংস্কারের পক্ষে দেওয়া জনগণের অপর রায়টি (গণভোট) গ্রহণ করতে হঠাৎ এত কাঠিন্য দেখা দিচ্ছে কেন? স্বৈরাচার কেন বিদায় নিয়েছে এবং জনগণ কেন একটি নতুন বাংলাদেশ দেখার সুযোগ পেয়েছে, তা ক্ষমতাসীনদের সবসময় মনে রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
সংবিধানের সীমাবদ্ধতার প্রসঙ্গ টেনে এই অধিকারকর্মী বলেন, সংবিধানে অনেক আইনি কাঠামো লিপিবদ্ধ থাকলেও একটি অভাবনীয় গণঅভ্যুত্থান, বিপ্লব কিংবা প্রবল জনরোষে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার কোনো কথা সেখানে লেখা ছিল না। কিন্তু দেশের আপামর জনগণ সেই অঘোষিত বাস্তবতাগুলোকে আলিঙ্গন করেছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বিগত সরকার দীর্ঘদিন টিকে থাকার চেষ্টা করেছিল কারণ তারা জনগণের প্রকৃত রায়কে উপেক্ষা করেছিল। বর্তমান সরকারকে সেই একই ভুল পথ থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এখন আইনি বা শাব্দিক তর্ক করার সময় নয়, বরং সরকার যে সত্যিকার অর্থেই জনগণের সঙ্গে আছে—তা কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করার সময়। জনগণ সবকিছুর ঊর্ধ্বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি সরকার বিশ্বাস করে যে জনগণ সংবিধানের উপরে, তবে জনগণের রায়কে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।
একই কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর। তিনি উল্লেখ করেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত গণভোটে দেশের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে জোরালো রায় দিয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত হতাশার বিষয় হলো, ঈদের আগের সংসদ অধিবেশনে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত বা রোডম্যাপ দেখা যায়নি। আইনি মারপ্যাঁচ বা পদ্ধতিগত অজুহাত দেখিয়ে বিপুল জনসমর্থিত এই গণভোটকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কোনোভাবেই সমীচীন হবে না বলে তিনি সতর্ক করেন।
আজ রোববার থেকেই জাতীয় সংসদের নতুন অধিবেশন শুরু হচ্ছে। এই অধিবেশনেই অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের উদ্যোগ নিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন আন্দোলনকারীরা। মানববন্ধনে উপস্থিত শতাধিক জুলাইযোদ্ধা, লেখক, অ্যাক্টিভিস্ট ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা স্পষ্ট হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, সরকার যদি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে আরও টালবাহানা বা সময়ক্ষেপণ করে, তবে বাধ্য হয়ে তারা আবারও রাজপথে কঠোর আন্দোলনে নামবেন।
উল্লেখ্য, সংসদ অধিবেশনের সার্বিক নিরাপত্তার কারণে পুলিশের বিশেষ অনুরোধে নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা আগেই দুপুর ১টায় এই মানববন্ধন কর্মসূচি সমাপ্ত করা হয়।