তৈরি হচ্ছে এক প্রলয়ংকরী যুদ্ধের নীল নকশা। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের গন্ধ আর সমুদ্রপথে রণতরীর আনাগোনা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যে চলমান ত্রিমুখী সংঘাত এখন আর কেবল আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতায় নেই; এটি এখন বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালি’কে কেন্দ্র করে এক মরণপণ লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। এই সংঘাতের সরাসরি শিকার হিসেবে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন খাদের কিনারে। একদিকে বিশ্ববাজারে তেলের আকাশছোঁয়া দাম, অন্যদিকে দেশের ভেতরে তেলের পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি—সব মিলিয়ে এক গভীর সংকটের আবর্তে বাংলাদেশ।
২০২৬ সালের ১ এপ্রিল দিনটি বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এদিন ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে নজিরবিহীন হামলা চালায়। শতাধিক ভারী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং অন্তত ২০০টি রকেটের আঘাতে কেঁপে ওঠে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল। বাহরাইনের মার্কিন ঘাঁটি এবং কুয়েতের আল-আদিরি ঘাঁটিতে অবস্থিত মার্কিন হেলিকপ্টার ইউনিট এই হামলার সরাসরি লক্ষ্যবস্তু হয়। ইরানের দাবি অনুযায়ী, তারা অন্তত একটি মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টার ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে।
এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষা ছিল অত্যন্ত কঠোর এবং আক্রমণাত্মক। ২ এপ্রিল সকালে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। ট্রাম্পের ভাষায়, “ইরান প্রস্তর যুগে থাকার যোগ্য, আমরা তাদের সেখানেই ফিরিয়ে নেব।” তিনি আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং তেল উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক বিমান হামলার আল্টিমেটাম দিয়েছেন। এই আল্টিমেটামের অর্থ হলো—হয় ইরানকে ওয়াশিংটনের দেওয়া ‘অবাস্তবসম্মত’ শর্তে চুক্তিতে আসতে হবে, নতুবা ধ্বংস হয়ে যাবে দেশটির আধুনিক কাঠামো।
বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘হরমুজ প্রণালি’। ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে এই নৌরুটটি বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অপরিহার্য। বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
বার্ষিক চাহিদা: প্রায় ৬৮ লাখ টন।
আমদানি: ৬৩ লাখ টন (যার মধ্যে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল)।
হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা: দেশের মোট চাহিদার প্রায় ২২ শতাংশ।
বাংলাদেশ মূলত সৌদি আরবের ‘সৌদি আরামকো’ এবং দুবাইয়ের ‘আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি’ (এডিএনওসি) থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। এই তেলের পুরোটাই হরমুজ প্রণালি হয়ে বাংলাদেশের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পৌঁছায়। বর্তমানে এই রুটটি যুদ্ধের কারণে কার্যত অবরুদ্ধ। যদিও ১ এপ্রিল ইরান ছয়টি আটকে পড়া বাংলাদেশি জাহাজকে পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে, কিন্তু ট্রাম্পের নতুন হুমকির পর এই নৌরুট কতক্ষণ নিরাপদ থাকবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় দেখা দিয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরুল ইমামের মতে, “হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার অর্থ হলো বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহের চেইনটি যেকোনো মুহূর্তে ছিঁড়ে যাওয়া। আমরা যদি দ্রুত বিকল্প উৎস না খুঁজি, তবে দেশের শিল্প ও পরিবহন খাত স্থবির হয়ে পড়বে।”
জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) তাদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানিয়েছে, এই যুদ্ধের ফলে আরব অর্থনীতির অন্তত ৬ শতাংশ সংকোচন ঘটতে পারে। মুদ্রার অঙ্কে যার পরিমাণ প্রায় ১৯৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই বিপর্যয়ের ঢেউ ইতিপূর্বে বাংলাদেশের স্বর্ণের বাজারে আছড়ে পড়েছে। বাজুসের তথ্যমতে, দেশে সোনার দাম রেকর্ড ভেঙে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৯৭৭ টাকা ছাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৪ হাজার ৬৭৫ ডলার অতিক্রম করা এই অস্থিতিশীলতারই প্রতিফলন।
তেলের দাম যদি ব্যারেল প্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছায়—যা বর্তমানে অনেক বিশ্লেষকই আশঙ্কা করছেন—তবে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় অসহনীয় হয়ে উঠবে। বর্তমান অর্থ বছরে জ্বালানি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করছে পেট্রোবাংলা।
সরকার বারবার দাবি করছে যে দেশে তেলের কোনো সংকট নেই, কিন্তু রাজপথের চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। পাম্পগুলোতে তেলের জন্য হাহাকার এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহনের অপেক্ষা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এই সংকটের পেছনে দুটি প্রধান কারণ কাজ করছে: ১. প্যানিক বায়িং: যুদ্ধের খবরে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করে মজুত করছে। ২. অসাধু সিন্ডিকেট: একদল অসাধু ব্যবসায়ী ও পাম্প মালিক কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তেলের দাম বাড়ানোর পায়তারা করছে।
ইতোমধ্যেই প্রশাসনের অভিযানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৬৪ হাজার লিটার অবৈধ তেল উদ্ধার করা হয়েছে। তেলের ডিপোগুলোতে বিজিবি মোতায়েন এবং পাম্পগুলোতে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ দেওয়া হলেও সংকটের স্থায়ী সমাধান মিলছে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই মজুতদারি এবং চোরাচালান প্রতিরোধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
বর্তমান জ্বালানি সংকটের মূলে রয়েছে বিগত স্বৈরাচারী সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব। গত সাড়ে ১৫ বছরে জ্বালানি খাতকে পরিকল্পিতভাবে আমদানিনির্ভর করে তোলা হয়েছে। নিজস্ব গ্যাস ও তেল অনুসন্ধানে কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে কেবল লুটপাটের উদ্দেশ্যে বিদেশ থেকে জ্বালানি কেনার নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল। যেকোনো দেশের জন্য অন্তত ৩ মাসের জ্বালানি মজুত রাখা বাধ্যতামূলক হলেও, বাংলাদেশ বর্তমানে এক মাসের মজুত নিয়ে ধুঁকছে।
সদ্য ক্ষমতা গ্রহণ করা সরকারকে এখন দ্বিগুণ দাম দিয়ে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। যেখানে আগে এলএনজি প্রতি এমএসবিটিইউ ৯ থেকে ১০ ডলারে কেনা হতো, সেখানে এখন তা ২২ ডলারে কিনতে হচ্ছে। এটি সরকারের জন্য এক বিশাল আর্থিক বোঝা।
এই ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের মাঝে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত নাজুক। একদিকে আমেরিকা তাদের সামরিক স্বার্থে বাংলাদেশকে পাশে পেতে চায়, অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার সমর্থনপুষ্ট মিয়ানমারের জান্তা সরকার ও রাখাইন স্টেট বাংলাদেশের সীমান্তে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করছে।
আরাকান আর্মি রাখাইনের ৮৫ শতাংশ এলাকা দখল করে নেওয়ায় এবং মার্কিন প্রশাসনের ‘বার্মা অ্যাক্ট’ পাসের ফলে মিয়ানমার সীমান্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়তে পারে। আমেরিকা যদি মিয়ানমারে জান্তা সরকারকে হটাতে বাংলাদেশকে কোনো সামরিক বা লজিস্টিক সহায়তার জন্য চাপ দেয়, তবে তা বাংলাদেশের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই কঠোর নীতির মুখে বাংলাদেশ কীভাবে তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে এবং একই সঙ্গে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করবে—তা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে এখন তিনটি স্তরে কাজ করতে হবে:
ক. আমদানির বিকল্প উৎস: হরমুজ প্রণালির ওপর ২২ শতাংশ নির্ভরতা কমিয়ে অবিলম্বে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই বা এশিয়ার অন্যান্য তেল উৎপাদনকারী দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক নির্ভরতা না কমালে বাংলাদেশ বারবার এমন বিপদে পড়বে।
খ. নিজস্ব খনিজ সম্পদের উন্নয়ন: বিগত সরকারের আমদানিনির্ভর নীতি ত্যাগ করে দেশের সমুদ্রসীমায় এবং স্থলভাগে দ্রুত গ্যাস ও তেল অনুসন্ধানের কাজ শুরু করতে হবে। রাশিয়ার মতো দেশগুলোর প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে নিজস্ব খনিজ উত্তোলন বাড়ানোই হবে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষাকবচ।
গ. কৃত্রিম সংকট ও পাচার রোধ: সীমান্ত দিয়ে তেলের চোরাচালান বন্ধ করতে হবে। মজুতদারদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান আরও জোরদার করতে হবে যাতে তেলের পাম্পগুলোতে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ কেবল দুটি দেশের লড়াই নয়, এটি বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনের এক মহড়া। ট্রাম্পের ‘প্রস্তর যুগ’ বনাম ইরানের ‘প্রতিরোধ ফ্রন্ট’—এই দুই মেরুর লড়াইয়ে বাংলাদেশ যাতে ছিটকে না পড়ে, তার জন্য প্রয়োজন বিচক্ষণ কূটনীতি এবং সাহসি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল তেলের যোগান নয়, এটি বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। বর্তমান সরকারকে এই সংকটে কেবল স্বল্পমেয়াদী সমাধান নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদী ‘ন্যাশনাল এনার্জি সিকিউরিটি প্ল্যান’ নিয়ে এগোতে হবে।
| পদের শ্রেণি | কর্মরত জনবল | শূন্য পদ |
|---|---|---|
| প্রথম শ্রেণি | ১,৯০,৭৭৩ জন | ৬৮,৮৮৪টি |
| দ্বিতীয় শ্রেণি | ২,৩৩,৭২৬ জন | ১,২৯,১৬৬টি |
| তৃতীয় শ্রেণি | ৬,১৩,৮৩৫ জন | ১,৪৬,৭৯৯টি |
| চতুর্থ শ্রেণি | ৪,০৪,৫৭৭ জন | ১,১৫,২৩৫টি |
| অন্যান্য ক্যাটাগরি | ৭,৯৮০ জন | ৮,১৩৬টি |
| সর্বমোট | ১৪,৫০,৮৯১ জন | ৪,৬৮,২২০টি |
পৃথিবী এখন এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য প্রতিটি পদক্ষেপ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের এই আগ্নেয়গিরি যদি পুরোপুরি বিস্ফোরিত হয়, তবে তার উত্তাপ থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে আজই নিতে হবে কঠোর ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।