দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অবশেষে ঢাকার দুই সিটি (উত্তর ও দক্ষিণ) এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রশাসনিক তোড়জোড় শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, এই তিন গুরুত্বপূর্ণ সিটির নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রাথমিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য কমিশনের নজর এখন সরকারের ‘গ্রিন সিগন্যাল’ বা সবুজ সংকেতের দিকে।
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনের মেয়াদ প্রথম সভা থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর পর্যন্ত। এই পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার সাংবিধানিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে পাঠানো চিঠিতে তিন সিটির মেয়াদের যে খতিয়ান দেওয়া হয়েছে তা নিম্নরূপ:
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন: ২০২০ সালের ২ জুন প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ায় গত বছরের (২০২৫) ১ জুন এই সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন: ২০২০ সালের ৩ জুন প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সে অনুযায়ী গত ২ জুন ২০২৫-এ এই সিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন: ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ায় চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি এই সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে।
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ১ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা ছাড়ার আগে বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার এই তিন সিটি নির্বাচন আয়োজনের জন্য কমিশনকে চিঠি দিয়েছিল। সেই চিঠির সূত্র ধরেই প্রাথমিক কাজ শুরু করে ইসি। তবে এরই মধ্যে দেশে নতুন দলীয় সরকার গঠিত হওয়ায় কৌশলগত কারণে বর্তমান সরকারের নীতিগত মতামত জানতে চায় সাংবিধানিক এই সংস্থাটি। মূলত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক বিবেচনাতেই এই ‘সবুজ সংকেত’-এর অপেক্ষা।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ সম্প্রতি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো মূলত সরকারের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে, কমিশন কেবল আয়োজক। তাই সরকারের সাথে আলাপ-আলোচনা করেই শিগগিরই একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠকের মাধ্যমে নির্বাচনের তারিখ ও সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে।”
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে দেশের প্রায় সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের (মেয়র ও চেয়ারম্যান) বরখাস্ত করা হয়েছিল। বর্তমানে ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা এবং ৪৯৭টি উপজেলা প্রশাসক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ব্যতিক্রম ছিল কেবল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, যেখানে আদালতের আদেশে শাহাদাত হোসেন মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও সম্প্রতি তার মেয়াদও শেষ হয়েছে।
বর্তমানে দেশের এই তিন প্রধান অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্রে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় নাগরিক সেবা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ উঠছে। ফলে জনমনেও দ্রুত নির্বাচনের দাবি জোরালো হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর নির্বাচনি ব্যবস্থার সংস্কার এবং ভোটার তালিকা হালনাগাদের মতো বিষয়গুলো সামনে আসতে পারে। ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, সীমানা নির্ধারণ বা নতুন করে ভোটার তালিকার জটিলতা না থাকলে সরকারের সংকেত পাওয়া মাত্রই ৯০ দিনের মধ্যে ভোটগ্রহণ সম্ভব। তবে জ্বালানি সংকট এবং বর্তমান অর্থনৈতিক চাপের মুখে এত বড় তিনটি নির্বাচন আয়োজনের ব্যয়ভার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার কতটা দ্রুত সাড়া দেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ঢাকার দুই উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রামের মতো মেগাসিটির বাসিন্দারা এখন তাকিয়ে আছেন সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে। প্রশাসক প্রথা সরিয়ে জনগনের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে নগর প্রশাসনের দায়িত্ব তুলে দেওয়াই এখন সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচন কমিশন সব প্রস্তুতি সম্পন্ন রাখলেও বল এখন সরকারের কোর্টে। সরকার সবুজ সংকেত দিলেই ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই তিন সিটিতে ভোটযুদ্ধ শুরু হতে পারে।