রাজধানীতে মশার উপদ্রব এখন অসহনীয় পর্যায়ে। দিন-রাত মশার কামড়ে অতিষ্ঠ নগরবাসীর জন্য নতুন দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি তেলের সংকট। ডিজেলের অভাবে মশা নিধনের প্রধান হাতিয়ার ‘ফগিং’ বা ওষুধের ধোঁয়া ছিটানো কার্যক্রম যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উড়ন্ত মশা নিধনে ব্যবহৃত ফগিং মেশিনের জন্য প্রধান উপাদানই হলো ডিজেল (কীটনাশক মিশ্রণের প্রায় ৯০ শতাংশ)। বর্তমানে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের ডিজেল মজুত শেষ পর্যায়ে।
ডিএনসিসি (উত্তর): জরুরি চাহিদা ৩ লাখ ২৭ হাজার লিটার। বর্তমানে যে মজুত আছে, তা দিয়ে বড়জোর ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত কাজ চালানো সম্ভব।
ডিএসসিসি (দক্ষিণ): জরুরি চাহিদা ২ লাখ লিটার। প্রতিদিন ফগিংয়ের জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় সাড়ে ৪ হাজার লিটার ডিজেল।
জ্বালানি নিশ্চিত করতে দুই সিটি কর্তৃপক্ষ এবং ওষুধ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানিসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিচ্ছে।
গত এক দশকে মশা মারতে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন ব্যয় করেছে প্রায় ৮৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ডিএনসিসি ৫৬০ কোটি এবং ডিএসসিসি ২৭০ কোটি টাকা খরচ করেছে। চলতি অর্থবছরেও (২০২৪-২৫) বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৫৪ কোটি টাকা।
বিপুল এই অর্থ ব্যয়ে মশা মারতে নানা আধুনিক ও অদ্ভুত পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে:
মশা শনাক্তে ড্রোন ওড়ানো।
জলাশয়ে হাঁস, ব্যাঙ ও গাপ্পি মাছ ছাড়া।
বিদেশি উন্নত মানের কীটনাশক প্রয়োগ।
তবে বিশেষজ্ঞ ও নগরবাসীদের মতে, ড্রোনের ওড়াউড়ি বা ব্যাঙের ডাক—কোনো কিছুই মশার বংশবৃদ্ধি ঠেকাতে পারেনি। তদারকির অভাব এবং কাউন্সিলর না থাকায় মশক নিধন কার্যক্রমের গতি এখন অনেকটাই শ্লথ।
রাজধানীর মিরপুর ও বাসাবো এলাকার বাসিন্দারা জানান, এখন দিনের বেলাতেও কয়েল জ্বালিয়ে বা মশারির ভেতরে থাকতে হচ্ছে। মিরপুরের আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “সন্ধ্যা নামলে মশা যেন তেড়ে আসে। ছোট বাচ্চার সুরক্ষায় সারাদিন মশারির ভেতরে রাখতে হচ্ছে।” তদারকির অভাবে অনেক এলাকায় নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হচ্ছে না বলেও অভিযোগ উঠেছে।
কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, “সিটি কর্পোরেশনের উচিত সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে জনসচেতনতা সৃষ্টি করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ করা। শুধু ওষুধ ছিটিয়ে সমাধান সম্ভব নয়।”
| অর্থবছর | ডিএনসিসি (কোটি) | ডিএসসিসি (কোটি) | মোট বরাদ্দ (কোটি) |
|---|---|---|---|
| ২০২৪-২৫ (চলতি) | ১১০.০০ | ৪৪.৪৭ | ১৫৪.৪৭ |
| ২০২৩-২৪ | ৮৪.৫০ | ৩৮.৮৩ | ১২৩.৩৩ |
| ২০২২-২৩ | ৭৬.০০ | ২৭.০০ | ১০৩.০০ |
| ২০২১-২২ | ৮৫.০০ | ৩১.০২ | ১১৬.০২ |
| ২০২০-২১ | ৭০.০০ | ২০.০২ | ৯০.০২ |
| ২০১৯-২০ | ৪৯.৩০ | ৩২.৭৫ | ৮২.০৫ |
| ২০১৮-১৯ | ২১.০০ | ২৬.০০ | ৪৭.০০ |
| ২০১৭-১৮ | ২০.০০ | ২৫.৬০ | ৪৫.৬০ |
| ২০১৬-১৭ | ২৩.২৫ | ১১.৫০ | ৩৪.৭৫ |
| ২০১৫-১৬ | ১৪.০০ | ১২.৫০ | ২৬.৫০ |
| বিগত ১০ বছরে মোট | ৫৬০.০০ | ২৭০.০০ | ৮৩০.০০ |
ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান এবং ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম জানিয়েছেন, তারা মশক নিধনে কোনো শিথিলতা বরদাশত করবেন না। জ্বালানি সংকট সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং যেখানে মশার লার্ভা পাওয়া যাবে সেখানে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।