বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩২ অপরাহ্ন

ধারণক্ষমতার চারগুণ বাসে স্থবির ঢাকা: অতিরিক্ত বাসের রুট পারমিট বাতিলের পরিকল্পনা

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা / ৭২ বার
প্রকাশ: শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬

রাজধানীর গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ—এই তিন আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল এখন ঢাকার যানজটের প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, টার্মিনাল তিনটিতে মাত্র ১ হাজার ২৫০টি বাস রাখার জায়গা থাকলেও বর্তমানে সেখানে প্রতিদিন চলাচল করছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার বাস। ধারণক্ষমতার এই চরম লঙ্ঘন এবং যত্রতত্র পার্কিংয়ের ফলে রাজধানীজুড়ে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী যানজট। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবার অতিরিক্ত ও অবৈধ বাসের রুট পারমিট বাতিলের কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

ধারণক্ষমতা বনাম বাস্তবতার করুণ চিত্র

মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ঢাকার প্রতিটি টার্মিনালই এখন তার ক্ষমতার সীমানা ছাড়িয়ে গেছে।

  • গাবতলী টার্মিনাল: এখানে মাত্র ২৫০টি বাসের ধারণক্ষমতা থাকলেও উত্তর ও দক্ষিণ-বঙ্গগামী প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার বাস এখান থেকে পরিচালিত হচ্ছে।

  • মহাখালী টার্মিনাল: ৩৫০টি বাসের জায়গার বিপরীতে প্রতিদিন ১ হাজার ২০০-এর বেশি বাস যাতায়াত করছে।

  • সায়েদাবাদ টার্মিনাল: এটি রাজধানীর বৃহত্তম টার্মিনাল যার ক্ষমতা ৬৫০টি বাসের, কিন্তু বাস্তবে এখানে ২ হাজার ২০০-এর বেশি বাস চলাচল করছে। অর্থাৎ প্রতিটি টার্মিনাল তার ক্ষমতার তিন থেকে চার গুণ বেশি বাসের চাপ বহন করছে।

সড়ক দখল করে অবৈধ পার্কিং ও কাউন্টার

সরেজমিনে সায়েদাবাদ টার্মিনাল পরিদর্শন করে দেখা গেছে, টার্মিনালের ভেতরে জায়গা না থাকায় অধিকাংশ বাস মূল সড়কের ওপর সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। নিয়ম ভেঙে সড়কের ওপরই একাধিক টিকিট কাউন্টার স্থাপন করা হয়েছে। যাত্রী সংগ্রহের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় বাসগুলো মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে এবং সড়কের একটি বড় অংশ স্থায়ীভাবে দখল হয়ে থাকছে। এতে ব্যস্ত সময়ে ঢাকার প্রবেশ ও বহির্গমন পথগুলো স্থবির হয়ে পড়ছে।

ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ বাসের রুট পারমিট বাতিল

ঢাকার যানজট নিরসনে গত ২৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, টার্মিনালগুলোর ধারণক্ষমতার বাইরে থাকা বাসের চাপ কমাতে রুট পারমিট বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, যেসব বাসের অর্থনৈতিক আয়ু শেষ হয়ে গেছে এবং যাদের ফিটনেস বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই, সেগুলোর রুট পারমিট সবার আগে বাতিল করা হবে। পর্যায়ক্রমে টার্মিনালের বাসের সংখ্যা ধারণক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা হবে।

টার্মিনাল স্থানান্তর ও বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ

ঢাকার ওপর চাপ কমাতে মহাখালী, সায়েদাবাদ, গাবতলী ও ফুলবাড়িয়া টার্মিনালগুলোকে শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে:

  • ফুলবাড়িয়া আন্তঃজেলা টার্মিনাল থেকে বিআরটিসি বাস কমলাপুরে এবং বেসরকারি বাস সায়েদাবাদে সরিয়ে নেওয়া হবে।

  • সায়েদাবাদের চাপ কমাতে কাঁচপুরে নির্মাণাধীন নতুন আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের কাজ দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

  • গুলিস্তান এলাকায় সিটি সার্ভিসের জন্য একটি নির্দিষ্ট টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।

পরিবহন মালিকদের প্রস্তাব ও রোটেশন পদ্ধতি

টার্মিনালগুলোকে অনেকেই এখন ডিপো হিসেবে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম। তিনি জানান, সমস্যা সমাধানে ‘রোটেশনভিত্তিক’ বাস পরিচালনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট সংখ্যক বাস টার্মিনালে থাকবে এবং বাকিগুলো নিজস্ব ডিপো বা নির্ধারিত পার্কিংয়ে অবস্থান করবে। সময় অনুযায়ী বাসগুলো টার্মিনালে এসে যাত্রী নিয়ে রওয়ানা হবে। এতে সড়কের ওপর পার্কিংয়ের প্রয়োজনীয়তা থাকবে না।

জনজীবনে শৃঙ্খলা ফেরার প্রত্যাশা

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মহাপরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের শৃঙ্খলা ফিরবে। বিশেষ করে পুরনো ও লক্কড়-ঝক্কড় বাস রাস্তা থেকে সরিয়ে দিলে দূষণ কমার পাশাপাশি যান চলাচলের গতি বাড়বে। তবে মালিক সমিতির সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত এই সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি।


এ জাতীয় আরো খবর...