রুবেল হোসেন—নামটি শুনলেই বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্তটি। অ্যাডিলেড ওভালে তার আগুনঝরা ইয়র্কারে স্টাম্প উড়ে যাওয়ার দৃশ্য বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক ফ্রেম। দীর্ঘ ৫ বছর জাতীয় দলের বাইরে থাকার পর অবশেষে সেই ‘অ্যাডিলেড হিরো’ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক আবেগঘন স্ট্যাটাসের মাধ্যমে ৩৬ বছর বয়সী এই ডানহাতি ফাস্ট বোলার তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
ফেসবুক পোস্টে রুবেলের আবেগী বার্তা
জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়ে রুবেল তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, “আমি পেসার রুবেল হোসেন। বাংলাদেশের জার্সিতে খেলেছি ২৭ টেস্ট, ১০৪ ওয়ানডে এবং ২৮টি টি-টোয়েন্টি। জাতীয় দল আমার আবেগ; কিন্তু একটা সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় নিতেই হতো। সেই চিন্তা করেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে গুডবাই জানালাম।”
দীর্ঘ এই পথচলায় যারা পাশে ছিলেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি আরও লেখেন, “আমার পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, গণমাধ্যমকর্মী ও ভক্তদের ধন্যবাদ। বাকি সময়টাতেও এভাবেই আমাকে আপনাদের পাশে রাখবেন—এটাই আমার বিশ্বাস। অনেক ভালোবাসা সবার প্রতি।”
আন্তর্জাতিক মঞ্চকে বিদায় জানালেও দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এই পেসার।
পরিসংখ্যানের পাতায় রুবেলের ১২ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পথচলা শুরু হয় রুবেলের। এরপরের এক যুগে তিনি দেশের পেস বোলিং আক্রমণের অন্যতম ভরসা হয়ে ওঠেন। ‘স্লিংগিং’ বা রাউন্ডআর্ম বোলিং অ্যাকশন এবং গতির জন্য তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলাদা পরিচিতি পেয়েছিলেন।
২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১২ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তিনি তিন ফরম্যাট মিলিয়ে মোট ১৯৩টি উইকেট শিকার করেছেন। টেস্ট ও ওয়ানডে উভয় ফরম্যাটেই ইনিংসে ৫ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব রয়েছে তার ঝুলিতে। ২০২১ সালের ১ এপ্রিল অকল্যান্ডে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ম্যাচটিই হয়ে রইল জাতীয় দলের জার্সিতে তার শেষ ম্যাচ।
ক্যারিয়ারের সোনালি মুহূর্ত ও রূপকথা
রুবেলের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকালে দুটি মুহূর্ত সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে:
অ্যাডিলেডের সেই জাদুকরী ওভার: ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে ৪৯তম ওভারে স্টুয়ার্ট ব্রড এবং জেমস অ্যান্ডারসনকে একই ওভারে (১ম ও ৩য় বলে) বোল্ড করে বাংলাদেশকে ঐতিহাসিক এক জয় এনে দেন রুবেল। এই জয়ের মাধ্যমেই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার গৌরব অর্জন করেছিল।
কিউইদের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক ও রেকর্ড: ২০১৩ সালে মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডেতে হ্যাটট্রিক করার অসাধারণ এক কীর্তি গড়েন তিনি। সেই ম্যাচে মাত্র ২৬ রান দিয়ে ৬ উইকেট তুলে নেন রুবেল, যা সাবেক অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার সঙ্গে যৌথভাবে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের যেকোনো বোলারের সেরা বোলিং ফিগার।
এছাড়া, ২০১০ সালে ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডকে বাংলাওয়াশ (৪-০ ব্যবধানে সিরিজ জয়) করার পেছনেও এই পেসারের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল।
রুবেল হোসেনের এই বিদায়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের একটি বিশেষ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। গতির ঝড় তোলা এই পেসার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানালেও, অ্যাডিলেডের সেই দৌড় আর বুনো উল্লাস ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকবে চিরকাল।