দেশজুড়ে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে হামের প্রাদুর্ভাব। গত এক মাসেই প্রায় দুই শতাধিক শিশুর মৃত্যু জনমনে তীব্র আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউনিসেফ-এর (UNICEF) মতে, হাম বর্তমান ভ্যারিয়েন্টে কোভিড-১৯ এর চেয়েও দ্বিগুণ দ্রুতগতিতে ছড়াচ্ছে। এরই মধ্যে দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৬টিতেই হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দেশি-বিদেশি সংস্থার সহায়তায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করলেও, এখনো বিপুলসংখ্যক শিশু চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়ে গেছে।
মৃত্যুপুরী ঢাকা ও রাজশাহী
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র এক মাসে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন মিলিয়ে মোট ১৯৮ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
পরিসংখ্যান: এর মধ্যে ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে নিশ্চিত হামে এবং ১৬৬ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের সন্দেহজনক উপসর্গে। বুধবার (১৫ এপ্রিল) সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টাতেই ৩ জন শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে।
জেলাভিত্তিক মৃত্যু: এই প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে ঢাকা; এখানে মৃত্যু হয়েছে ৯৪ জন শিশুর। এরপরই রাজশাহীতে ৬৮ জন এবং চট্টগ্রামে ১৫ জন শিশু মারা গেছে।
কেন এই আকস্মিক ও ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য মূলত ‘হার্ড ইমিউনিটি’ (Herd Immunity) ভেঙে পড়াকেই দায়ী করছেন।
টিকার ঘাটতি ও ইমিউনিটি গ্যাপ: বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী জানান, একসময় দেশে হাম প্রায় নিয়ন্ত্রণের পর্যায়ে ছিল। আগে যেখানে ৯৭-৯৮ শতাংশ শিশু টিকা পেত, বর্তমানে তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) অনুযায়ী ৯ মাস ও ১৫ মাসে দুটি ডোজ নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও, অনেকেই দ্বিতীয় ডোজটি সম্পন্ন করেননি।
বন্ধ ছিল ‘ক্যাচ-আপ’ কর্মসূচি: করোনা মহামারির কারণে চার বছর পর পর অনুষ্ঠিত হওয়া ‘এমআর ক্যাচ-আপ’ কর্মসূচি চরমভাবে ব্যাহত হয়। ২০২৪ সালেও এটি অনুষ্ঠিত না হওয়ায় শিশুদের মধ্যে ৫-৬ বছরের একটি বিশাল ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ: বাংলাদেশে ইউনিসেফ-এর প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছেন, যেসব শিশুর বয়স ৯ মাসের নিচে (যারা এখনো টিকার আওতাভুক্ত হয়নি) এবং যারা ‘জিরো-ডোজ’ বা একটি টিকাও পায়নি, তারা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। সাম্প্রতিক ছুটির মৌসুমগুলোতে মানুষের যাতায়াত বাড়ায় হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এই বায়ুবাহিত রোগটি আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার যৌথ পদক্ষেপ
হামের এই লাগামহীন বিস্তার রোধে ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং গ্যাভি (Gavi)-এর সহায়তায় সরকার দেশজুড়ে ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ ও ‘ক্যাচ-আপ’ কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।
জরুরি টিকাদান: প্রথম ধাপে দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি অতি-ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১২ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ৫ এপ্রিল থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র আট দিনেই ৯ লাখ ৪৩ হাজার ৩৪০ জন শিশুকে সফলভাবে টিকা দেওয়া হয়েছে। যেসব এলাকায় এখনো কর্মসূচি পৌঁছায়নি, সেখানে আগামী ২০ এপ্রিল থেকে টিকাদান শুরু হবে।
হাসপাতালের প্রস্তুতি: স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জানিয়েছেন, আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা, ভেন্টিলেটর এবং ওষুধ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
দায় ও সচেতনতা: টিকাদানে অতীতের গাফিলতির কথা স্বীকার করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো দ্রুততম সময়ে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় এনে পুনরায় হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করা। তিনি সাধারণ মানুষকে গুজবে কান না দিয়ে লক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার আহ্বান জানান।
এক মাসে এতগুলো শিশুর মৃত্যু দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। জাতীয় সংসদেও এই গাফিলতির তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জোরালো দাবি উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সমন্বিত এবং দ্রুত পদক্ষেপ ছাড়া এই মহামারি ঠেকানো প্রায় অসম্ভব।