শিরোনামঃ
মাঠে অরক্ষিত কৃষক: বজ্রপাত রোধের কোটি টাকার প্রকল্পগুলো গেল কোথায়? চল্লিশ পেরোলেই খাদ্যাভ্যাসে চাই বাড়তি নজর: সুস্থ থাকতে পুরুষদের যা খাওয়া জরুরি বাবার হাজার কোটি টাকায় মোহ নেই, লন্ডনে সাধারণ চাকরি করেন অক্ষয়-পুত্র প্রধানমন্ত্রী ও জাইমা রহমানকে বাফুফেতে আমন্ত্রণ জানালেন অধিনায়ক আফিদা হাম-রুবেলার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে কাল থেকে সারা দেশে টিকাদান কর্মসূচি শুরু আ. লীগকেও পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া উচিত: রাশেদ খান জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে আইএমএফের শর্তের কোনো সম্পর্ক নেই: অর্থমন্ত্রী সংসদে সরকারি দলের এমপিদের অঙ্গভঙ্গি: তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জামায়াত আমিরের ‘সরকার জ্বালানি সংকট নিয়ে মিথ্যাচার করছে’: সংসদে রুমিন ফারহানা কিউবার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একজোট মেক্সিকো, স্পেন ও ব্রাজিল
সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:০৩ পূর্বাহ্ন

দেশের টাকা পাচারের নেপথ্য খেলোয়ার কারা?

নিজস্ব অনুসন্ধানী প্রতিবেদক / ১৭ বার
প্রকাশ: রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬

রাজা হারিয়েছেন রাজ্য, ব্যবসায়ী হারিয়েছেন জাহাজ, কৃষক হারিয়েছেন ফসল — বাংলার ইতিহাসে এমন নজির অনেক আছে। কিন্তু এমন সময় খুব কম এসেছে যখন একটি রাষ্ট্র নিজেই বুঝতে পারে না যে তার রক্তক্ষরণ হচ্ছে বছরের পর বছর। বাংলাদেশের অর্থপাচারের গল্পটা ঠিক তেমনই — এক অজানা, নিঃশব্দে ঘটে যাওয়া অর্থনৈতিক মহাপ্লাবন, যার স্রোত এসে পৌঁছেছে রাষ্ট্রের দোরগোড়ায়। একবার টাকা যদি দেশের সীমানা পেরিয়ে যায়, সেটি আর কেবল টাকা থাকে না — সেটি হয়ে যায় আইনের, কূটনীতির, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার এবং রাজনৈতিক শক্তির গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাওয়া সম্পদ।

সংখ্যার ভেতরে লুকানো ভয়াবহতা

বিষয়টি কতটা গভীর, তা সংখ্যাতেই বোঝা যায়। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত মাত্র এক দশকে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে — বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৭ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। আর প্রতি বছর গড়ে পাচার হচ্ছে ৭৫৩ কোটি ডলারেরও বেশি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি জানিয়েছেন, বিগত সরকারের আমলে মোট পাচারের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩৪ বিলিয়ন ডলারে — বাংলাদেশি টাকায় যা সাড়ে আট লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি।

এই অঙ্কটা যদি সাধারণভাবে ধরা হয়, তাহলে এই অর্থ দিয়ে অন্তত ২৫টি পদ্মা সেতু তৈরি করা যেত। অর্থাৎ আমরা শুধু টাকাই হারাইনি — হারিয়েছি সম্ভাবনা, কর্মসংস্থান, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির হিসাব বলছে, স্বাধীনতার পর থেকে ৫০ বছরে মোট পাচারের পরিমাণ ছাড়িয়েছে ১২ লাখ কোটি টাকা। এর অর্থ হলো দেশের প্রতিটি নাগরিকের রক্ত, ঘাম ও পরিশ্রমের একটা বড় অংশ গেছে অন্যের পকেটে — বিদেশের মাটিতে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট, সেকেন্ড হোম আর গোপন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে।

পাচারের পথ: মিস-ইনভয়সিং থেকে শেল কোম্পানি

এই পাচারের প্রধান পথ ছিল আমদানি-রপ্তানির হিসাবে জালিয়াতি, যাকে বলা হয় ‘মিস-ইনভয়সিং’। কাগজে-কলমে পণ্যের দাম বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেখানো হয়েছে, আর সেই ফাঁক দিয়েই টাকা সরে গেছে বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। অর্থনীতির ভাষায় এটি ট্রেড-বেসড মানি লন্ডারিং — যেটি সারা বিশ্বে অবৈধ অর্থ পাচারের সবচেয়ে জনপ্রিয় পন্থা। পাশাপাশি ব্যবহার করা হয়েছে শেল কোম্পানির আড়াল। কিছু দেশ বা অঞ্চল আছে যেখানে কোম্পানির প্রকৃত মালিকের নাম গোপন রাখা হয়। পাচারকারীরা সেই শেল কোম্পানির আড়ালে সম্পদ লুকিয়ে রাখে। ফলে টাকা এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরতে থাকে — যেন তার কোনো নাগরিকত্বই নেই।

পাচারের গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও হংকং। এর বাইরে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসের মতো কর-ফাঁকির অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতেও গেছে বিপুল অর্থ। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু ২০২১ সালেই সেই দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থ ছিল ৮৭ কোটি সুইস ফ্রাঁরও বেশি।

কারা খেলল এই ভয়ংকর খেলা?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো — এই অর্থ কোথা থেকে এলো? উত্তরটা সহজ কিন্তু যন্ত্রণাদায়ক। এটা আমাদেরই টাকা — আমাদের করের টাকা, শ্রমের টাকা, ভবিষ্যতের টাকা। কিন্তু সেই টাকা দেশের ভেতরে বিনিয়োগ না হয়ে চলে গেছে বিদেশে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনে এই পাচার-প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর নাকের ডগায় বসেই চলেছে। কারণ খোদ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা এ বিষয়ে সাফাই গেয়েছেন, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার কর্তাব্যক্তিরাও এই অর্থপাচারে সহযোগিতা করেছেন। যারা বাধা দিতে গিয়েছেন, তারা হয়রানির শিকার হয়েছেন।

সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, অতীতে দলীয় আনুগত্য দিয়েই টাকা পাচার পার পেয়েছে। অর্থাৎ যারা টাকা সরিয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক আইন, অফশোর কোম্পানি এবং ব্যাংকিং গোপনীয়তার সব ফাঁকফোকর জেনেই কাজ করেছে। এটা নিছক দুর্নীতি নয় — এটা একটি সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় লুণ্ঠন, যেখানে অপরাধীরা আইনের বর্মের আড়ালেই ছিল।

ফেরত আনা কি সম্ভব? আন্তর্জাতিক আইনের গোলকধাঁধা

সাধারণ মানুষ ভাবছেন — টাকা চিহ্নিত হলেই বুঝি ফেরত আসবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনে কোনো দেশ সন্দেহের ভিত্তিতে এক ডলারও ফেরত দেয় না। প্রথমে প্রমাণ করতে হয় যে টাকা বৈধভাবে উপার্জিত ছিল না। তারপর প্রমাণ করতে হয় যে সেটি পাচার হয়েছে। এরপর বিদেশি আদালতের নির্দেশ লাগে সম্পদ জব্দের জন্য। তারপর শুরু হয় মূল দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া। প্রতিটি ধাপেই প্রতিপক্ষের আইনজীবী প্রমাণ দুর্বল করার চেষ্টা করে। এটা রাজনৈতিক বক্তৃতার বিষয় নয়, এটা দীর্ঘমেয়াদি আইনি যুদ্ধ।

তবে ইতিহাস বলছে, এই যুদ্ধ অসম্ভব নয়। ফিলিপাইন সাবেক প্রেসিডেন্ট মার্কোসের পাচার করা সম্পদের বড় অংশ ফিরিয়ে নিয়েছে। নাইজেরিয়া বহু বছর পর আবাচা পরিবারের লুকানো বিলিয়ন ডলার উদ্ধার করেছে। তবে দুই দেশই একটি বিষয় শিখেছে — ধৈর্য ছাড়া এই যুদ্ধে জয় নেই। আন্তর্জাতিক আদালত প্রথমেই দেখে নিজ দেশে সত্যিকারের বিচার হচ্ছে কিনা। যদি না হয়, তাহলে তারা সম্পদ ফেরত দিতে আগ্রহী হয় না।

সরকারের পদক্ষেপ: ১১টি যৌথ তদন্ত দল মাঠে

বর্তমান সরকার পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে সরাসরি অঙ্গীকার করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, পাচারকারীদের শনাক্ত ও আইনি ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সিআইডি, এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল এবং শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে। সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছে এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত এনে জনকল্যাণে ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

দুদক ইতোমধ্যে দেশের বৃহৎ ১০টি ব্যবসায়ী গ্রুপের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানে পৃথক তদন্ত টিম গঠন করেছে। এর পাশাপাশি পাচার হওয়া অর্থ শনাক্তকরণ ও ফেরত আনার প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের জন্য কমিশন ব্যবস্থাও বিবেচনাধীন রয়েছে — যা আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত একটি কার্যকর উৎসাহমূলক পদ্ধতি। সরকার আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার কথাও জানিয়েছে।

চ্যালেঞ্জ: তাড়াহুড়া নয়, ধৈর্যই একমাত্র অস্ত্র

জনগণ দ্রুত ফল চায়, কিন্তু আইন সময় চায় — এই সংঘাতই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। অতীতে একাধিক তদন্ত প্রভাবশালীদের চাপে থেমে গেছে। বর্তমান পরিবেশে সেই রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা না থাকলেও আইনি জটিলতা বিস্তর। বিদেশি ব্যাংক ও সরকারগুলো প্রতিটি দেশের আদালতের আলাদা নির্দেশনা ছাড়া এক টাকাও ছাড়ে না। একটি ভুল পদক্ষেপ কিংবা তাড়াহুড়া করা মানে গোটা প্রক্রিয়া বাতিল হওয়ার ঝুঁকি। এই যুদ্ধে তাই প্রয়োজন দক্ষ আইনজীবী, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বুদ্ধিমান ব্যবহার।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থপাচার বন্ধ না করলে উদ্ধার অভিযান অর্থহীন হয়ে যাবে। কারণ পুরনো পথ বন্ধ না করলে নতুন পাচার চলতেই থাকবে। তাই একইসঙ্গে দরকার কঠোর আমদানি-রপ্তানি নজরদারি, ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা এবং বড় লেনদেনের ওপর কার্যকর তদারকি। টিআইবি আগেই সতর্ক করেছিল — অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বাংলাদেশকে আইএমএফের দ্বারস্থ হতে হতো না, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটও তৈরি হতো না। সেই কথাটি আজ আরও জোরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

শেষ কথা: এটা অর্থফেরানোর লড়াই নয়, মর্যাদা ফেরানোর লড়াই

পাচার হওয়া এই সম্পদ কোনো সরকার বা দলের নয় — এটা মানুষের। একজন শ্রমিকের ঘাম, একজন প্রবাসীর রেমিটেন্স, একজন করদাতার আয় — সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এই সম্পদ। বাংলাদেশ এখন পরীক্ষার হলে বসে আছে। প্রশ্নপত্র কঠিন নয়, কিন্তু সময় দীর্ঘ। ভুল করলে নম্বর কাটা যাবে, আর তাড়াহুড়া করলে পুরো উত্তরপত্র বাতিল হয়ে যাবে।

ইতিহাস বলছে, পারা যায় — যদি তাড়াহুড়া না করা হয়। কারণ টাকা চুরি হতে সময় লাগে এক মুহূর্ত, কিন্তু বিচার ফিরে আসতে সময় লাগে এক যুগ। আর সেই যুগ পার করার ধৈর্য, দক্ষ মানুষ তৈরি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার — এই তিনটি উপাদান একসঙ্গে কাজ করলে বাংলাদেশ তার হারানো সম্পদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ফিরিয়ে আনতে পারবে। কারণ টাকা ফেরত আসে তখনই, যখন আইন, কূটনীতি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা একই পথে হাঁটে। সেই পথে হাঁটার সাহস এখন বাংলাদেশকেই দেখাতে হবে।


এ জাতীয় আরো খবর...