শিরোনামঃ
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেকের ১০ম বৈঠক অনুষ্ঠিত: ৭ হাজার কোটি টাকার ১৭ প্রকল্প উপস্থাপন স্বস্তির বৃষ্টি শুরু বিভিন্ন স্থানে: বিকেলে ঢাকায়ও বৃষ্টির পূর্বাভাস এপ্রিলের শেষ নাগাদ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে ১৯৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গরমে শিশুদের টিফিনে কী দেবেন? সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী গোলাম সারোয়ার মিলনের ইন্তেকাল এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে সন্তুষ্ট সরকার: ডিসেম্বরের মধ্যেই সব পাবলিক পরীক্ষা শেষের পরিকল্পনা সাগর-রুনি হত্যা মামলা: তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে আরও ৬ মাস সময় দিল হাইকোর্ট প্রখ্যাত আলোকচিত্রী রঘু রাই আর নেই সেমিফাইনালে শক্তিশালী ভারতের মুখোমুখি বাংলাদেশ, নিশ্চিত হলো ব্রোঞ্জ পদক কোটি টাকার সম্পদে ভাসছেন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের নেত্রীরা, জামায়াতের নেই মামলা
রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:১২ অপরাহ্ন

বিদ্যুতে ভর্তুকি ছাড়ে অর্থ বিভাগের কড়া শর্ত, সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বড় ঝুঁকির শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২ বার
প্রকাশ: রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬

বিদ্যুৎ খাতের বিপুল আর্থিক ঘাটতি মেটাতে প্রতি মাসে বড় অঙ্কের ভর্তুকির ওপর নির্ভর করতে হয় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি)। উৎপাদিত বিদ্যুতের ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যকার এই বিশাল ব্যবধান ঘোচাতে অর্থ বিভাগ নিয়মিত এই অর্থ ছাড় করে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় মার্চ মাসে বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানি (আইপিপি) ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল পরিশোধের জন্য ২ হাজার ৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি ছাড় করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে এবার এই অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে এমন কিছু নজিরবিহীন ও কঠোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাপনাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেনের সই করা এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি গত সপ্তাহে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব বরাবর পাঠানো হয়েছে। মোট ১৩টি শর্তসংবলিত ওই চিঠিতে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ছাড়কৃত ভর্তুকির অর্থ দিয়ে কোনোভাবেই বিদেশ থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করা যাবে না। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট ৮৫টি বেসরকারি আইপিপি ও ৯টি ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ছাড়া অন্য কোনো খাতের বিল মেটাতে এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে না। সবচেয়ে বড় বিপত্তির জায়গা হলো, যেসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিষয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেই, সেগুলোর বিল পরিশোধেও ভর্তুকির এই অর্থ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

শর্তের বেড়াজাল শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নেই। আগামী মে মাস থেকে ভর্তুকির অর্থ পেতে হলে বিপিডিবিকে বেশ কিছু নতুন নিয়ম মেনে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আলাদা প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জ যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং বর্তমানে অনুমোদিত ট্যারিফ সমন্বয়ের বিষয়টি রয়েছে। এছাড়াও আইপিপি, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলোর মাসভিত্তিক ক্ষতির আলাদা হিসাব এবং এসব কেন্দ্রের বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয়ে ভর্তুকির প্রকৃত চাহিদার বিস্তারিত বিবরণও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

অর্থ বিভাগের এই কঠোর অবস্থানের কারণে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে বিদ্যুৎ খাতের পুঞ্জীভূত বিপুল বকেয়া নিয়ে। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি ও যৌথ উদ্যোগে নির্মিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মোট বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের বিল পরিশোধ নিয়ে দেখা দিয়েছে নতুন জটিলতা। বর্তমানে ভারত থেকে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে বাংলাদেশ, যার বড় অংশই সরবরাহ করে আদানি পাওয়ার। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত এই আমদানি বিদ্যুতের বকেয়া বিল ৩ হাজার ৮৯২ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। বকেয়া পরিশোধ না করা হলে আদানি গ্রুপ বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে এরই মধ্যে চিঠি পাঠিয়েছে। নতুন শর্তের কারণে ভর্তুকির টাকায় আমদানি বিল শোধ করার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই সংকট এখন চরম আকার ধারণ করতে পারে।

অন্যদিকে, দেশে নতুন করে উৎপাদনে আসা বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বিলও আটকে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রমে যুক্ত হওয়া শেরপুরের বিআর পাওয়ার জেনের ১৬০ মেগাওয়াট এবং পটুয়াখালীতে চীনা অর্থায়নে নির্মিত আরএনপিএলের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিল এই জটিলতায় পড়তে যাচ্ছে। আরএনপিএল কেন্দ্রটি থেকে বিপিডিবি বর্তমানে বিদ্যুৎ নিচ্ছে এবং প্রতি মাসে তাদের বড় অঙ্কের বিল জমা হচ্ছে। কিন্তু সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটির অনুমোদন না থাকায় অর্থ বিভাগের শর্ত অনুযায়ী ভর্তুকির টাকা দিয়ে এই মেগা প্রকল্পগুলোর বিল পরিশোধ করা সম্ভব হবে না।

চলতি অর্থবছরে বিদ্যুতে ভর্তুকি বাবদ ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়ও করা হয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির চরম অস্থিতিশীলতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার কারণে এলএনজি ও ফার্নেস অয়েলের বাড়তি দাম এবং ডলার সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই ভর্তুকি প্রাপ্তিতে এমন কড়া শর্ত আরোপ হতাশ করেছে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, জ্বালানি আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়ে ভর্তুকি বৃদ্ধির বিষয়টি অর্থ বিভাগকে আগেই জানানো হয়েছিল। এর বিপরীতে অর্থ ছাড়ে এমন শর্ত বিদ্যুৎ খাতের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

বিষয়টি নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিপিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম। তিনি জানান, দেশের বিদ্যুতের তীব্র চাহিদার এই সময়ে অর্থ বিভাগের এ ধরনের শর্ত পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন। ভর্তুকি ও রাজস্ব আয়ের সামান্য অর্থ দিয়ে কোনোমতে তেল ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চালু রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই শর্ত মেনে উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখা প্রায় অসম্ভব হওয়ায় বিষয়টি তারা অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানাবেন বলে জানিয়েছেন।

তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এই পরিস্থিতিতেও কিছুটা আশাবাদী। তিনি জানান, অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের কিছু শর্ত থাকাটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এটি সম্পূর্ণভাবে দুই মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়। বিদ্যমান বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আলোচনা সাপেক্ষে এই জটিলতা দ্রুত নিরসন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।


এ জাতীয় আরো খবর...