শিরোনামঃ
দেশে হাম ও উপসর্গে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত দেড় হাজারেরও বেশি ৭ জানুয়ারি এসএসসি এবং ৬ জুন এইচএসসি শুরু রেকর্ড ঋণের বিলাসী বাজেট: চরম অর্থনৈতিক সংকটের মাঝেই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের বিপর্যয়: ৬৪ হাজার কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি ও টিকে থাকার লড়াই সংবিধান সংশোধন: সংসদের বিশেষ কমিটি বর্জনের পথে জামায়াত ও এনসিপি বিশ্বের দ্বিতীয় জনবহুল শহর ঢাকা, ২০৫০ সালে উঠবে শীর্ষে: জাতিসংঘ ফারাক্কার একচেটিয়া প্রভাব ঠেকাতে এবার ‘পদ্মা ব্যারাজ’ সীমান্তে কৃষকদের খাদ্য ও কৃষি নিরাপত্তা নেই: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: জাতীয় পার্টির খরচ মাত্র ৫ লাখ টাকা ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: ইরাক ও মরক্কো দলের অফিশিয়াল এআই স্পনসর গুগল জেমিনি
বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ০৫:২৭ অপরাহ্ন

ফারাক্কার একচেটিয়া প্রভাব ঠেকাতে এবার ‘পদ্মা ব্যারাজ’

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬

দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, পরিবেশগত বিপর্যয় এবং প্রতি বছর ফিরে আসা দুর্যোগের হাত থেকে দেশের একটি বিশাল অংশকে রক্ষার জন্য অবশেষে এক যুগান্তকারী ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। ভারতের ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাব এবং এর ফলে সৃষ্ট কৃত্রিম বন্যা ও খরা পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে দেশের অভ্যন্তরে ‘পদ্মা ব্যারাজ’ নির্মাণের এক মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর বর্ষাকালে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং অতিরিক্ত পানির চাপে ভারত যখন ফারাক্কা বাঁধের সব কটি গেট একসঙ্গে খুলে দেয়, তখন বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ বন্যায় প্লাবিত হয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে যখন পানির তীব্র হাহাকার দেখা দেয়, তখন ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশের নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে খাঁ খাঁ প্রান্তরে পরিণত হয়। এই দ্বিমুখী সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে এবং শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সংরক্ষণ করে স্বাদু পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থেকেই এই বিশাল প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে।

দেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখার স্বার্থে বুধবার সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই বিশাল কর্মযজ্ঞটি বাস্তবায়ন করতে সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ৫০ হাজার ৪৪৩ (পঞ্চাশ হাজার চারশ তেতাল্লিশ) কোটি টাকা। সম্পূর্ণ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সমন্বয়ে এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার দেশের পানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি স্বনির্ভর ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

প্রধান এই প্রকল্পের কারিগরি ও অবকাঠামোগত নকশার দিকে তাকালে এর বিশালত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। এই ব্যারাজটি রাজবাড়ী জেলার পাংশা পয়েন্টে নির্মাণ করা হবে, যার মোট দৈর্ঘ্য হবে ২.১ (দুই দশমিক এক) কিলোমিটার। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও বর্ষাকালের অতিরিক্ত পানি সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য এই ব্যারাজে মোট ৭৮টি অত্যাধুনিক স্পিলওয়ে গেট স্থাপন করা হবে। এর পাশাপাশি নদীর তলদেশের পলি ব্যবস্থাপনা এবং পানি নিষ্কাশনের সুবিধার্থে আরও ৭৮টি আন্ডার স্লুইস গেট সংযুক্ত থাকবে। নদীমাতৃক এই দেশে নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা যেন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সেজন্য এই ব্যারাজে ১৪ মিটার প্রস্থের একটি নেভিগেশন লক বা নৌ-চলাচলের বিশেষ পথ রাখা হয়েছে। এছাড়া, নদীর স্বাভাবিক বাস্তুসংস্থান এবং ইলিশসহ অন্যান্য দেশীয় মাছের অবাধ বিচরণের বিষয়টি মাথায় রেখে দুটি ২০ মিটার প্রশস্ত ফিশ পাস বা চ্যানেল রাখা হয়েছে, যা পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের সুবিধাভোগী এলাকা এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি অত্যন্ত ব্যাপক। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, প্রকল্পটি মূলত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে (কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, বরিশাল অঞ্চল) মরুকরণ ও লবণাক্ততার হাত থেকে বাঁচানোর একটি সুনির্দিষ্ট টার্গেট। পাংশায় পানি আটকে রাখলে পদ্মার প্রধান শাখা নদী গড়াইসহ ওই অঞ্চলের অন্যান্য নদীতে সারা বছর মিঠা পানির প্রবাহ ধরে রাখা যাবে। মিঠা পানির এই নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত হলে ওই অঞ্চলে সমুদ্রের লোনা পানি প্রবেশের হার ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে। এর ফলে কৃষিজমিতে লবণাক্ততার অভিশাপ দূর হবে, হাজার হাজার হেক্টর অনাবাদি জমি পুনরায় চাষের আওতায় আসবে এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা পাবে। পুরো প্রকল্পটি শতভাগ বাস্তবায়িত হলে দেশের ৪টি বিভাগের ২৬টি জেলার ১৩০টি উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি এর সুফল ভোগ করবে।

তবে এত বিপুল সম্ভাবনা ও আশাবাদের মধ্যেও একটি নিরেট ভৌগোলিক বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাজবাড়ীর পাংশায় পদ্মা ব্যারাজ নির্মিত হলেও উত্তরবঙ্গের (রংপুর ও রাজশাহী বিভাগ) বন্যা বা খরার সমস্যার কোনো সরাসরি সমাধান এটি দিতে পারবে না। এর কারণ হলো নদীর স্বাভাবিক গতিপথ। পানি সবসময় উজান থেকে ভাটির দিকে প্রবাহিত হয়। উত্তরবঙ্গের প্রধান নদীগুলো হলো তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার এবং ব্রহ্মপুত্র। আর পদ্মা নদী রাজশাহী ও পাবনার পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে রাজবাড়ীর পাংশায় এসেছে। পাংশা হলো উত্তরবঙ্গের তুলনায় নদীর ভাটি অঞ্চল। ফলে ভাটিতে ব্যারাজ করে পানি জমালে সেই পানি উল্টো দিকে বা উজানে নিয়ে যাওয়ার কোনো প্রাকৃতিক বা কারিগরি সুযোগ নেই। মূলত উত্তরবঙ্গের খরা ও বন্যার জন্য ফারাক্কা বাঁধ ততটা দায়ী নয়, যতটা দায়ী তিস্তা নদীর উজানে ভারতের নির্মিত গজলডোবা ব্যারাজ। শুষ্ক মৌসুমে ভারত গজলডোবা দিয়ে তিস্তার পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়ায় উত্তরবঙ্গে তীব্র খরা দেখা দেয়, আবার বর্ষায় পানি ছেড়ে দিলে আকস্মিক বন্যা হয়। তাই উত্তরবঙ্গের সংকট নিরসনে সরকারের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়ন এবং ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদী ড্রেজিং করে নাব্য বৃদ্ধি করার মতো সম্পূর্ণ ভিন্ন ও সমান্তরাল পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য।

অন্যদিকে, এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ সংক্রান্ত ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ১৯৯৬ সালে দুই দেশের মধ্যে যে ঐতিহাসিক ‘গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তির সময়সীমা শেষ হতে যাচ্ছে চলতি বছরের (২০২৬ সালের) ডিসেম্বর মাসেই। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে বাংলাদেশের নিজস্ব ভূখণ্ডে এ ধরনের একটি মেগা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ স্বাভাবিকভাবেই আঞ্চলিক পানি-রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ভারত যদি চুক্তির নবায়নে অনীহা দেখায় বা শুষ্ক মৌসুমে ন্যায্য হিস্যা প্রদানে টালবাহানা করে, তবে পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজস্ব একটি টেকসই বাফার জোন তৈরি করতে সক্ষম হবে, যা কূটনৈতিক দরকষাকষিতেও শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।

পরিশেষে, ফারাক্কার অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্ত করতে পদ্মা ব্যারাজ কেবল একটি কংক্রিটের কাঠামো নয়, এটি দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা রক্ষার প্রতীক। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য এটি আশীর্বাদ হলেও, প্রকৃত জাতীয় পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পদ্মা ব্যারাজের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের জন্য তিস্তাকেন্দ্রিক মহাপরিকল্পনাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিতে হবে। সরকারের এই বলিষ্ঠ পদক্ষেপ, সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা ও কূটনৈতিক তৎপরতা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও সুজলা-সুফলা বাংলাদেশ উপহার দিতে সক্ষম হবে।

তথ্যসূত্র: এশিয়া পোস্ট


এ জাতীয় আরো খবর...