দীর্ঘ দেড় যুগের রাজনৈতিক বনবাস আর চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল সময় পেরিয়ে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় পেয়েছে বিএনপি। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২০৯টিতে জয়লাভ করে এককভাবে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে দলটি। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সামনে এখন অফুরান সুযোগ, কিন্তু তার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ।
সংবিধান সংশোধনসহ রাষ্ট্র পরিচালনায় একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হলেও অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং ভূ-রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষা—এই তিন ফ্রন্টে বিএনপিকে কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশাল জয়ে শঙ্কা ও সম্ভাবনা
জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট বিএনপিকে ক্ষমতায় বসালেও সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তির পাশাপাশি শঙ্কাও কাজ করছে। অতীতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা দলগুলোর ‘ফ্যাসিবাদী বা কর্তৃত্ববাদী’ হয়ে ওঠার নজির বাংলাদেশে রয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনকাল যার বড় উদাহরণ।
তবে বিজয়ের পর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট করেছেন, প্রতিহিংসা নয়, বরং বিভক্তি দূর করে জাতীয় ঐক্য ও স্থিতিশীলতা ফেরানোই হবে তার সরকারের মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, “বিভক্তির বদলে ঐক্য ও শান্তি ফিরিয়ে আনাই আমাদের অগ্রাধিকার।”
চ্যালেঞ্জ ১: ভঙ্গুর অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর গত ১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। পুলিশসহ নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছিল, যা এখনো নড়বড়ে। মানবাধিকার সংগঠক নূর খান লিটনের মতে, “মব জাস্টিস বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা এবং ক্ষমতাচ্যুতদের ওপর হামলার ঘটনা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও অব্যাহত ছিল।” এই বাহিনীগুলোকে কার্যকর করা এবং জনমনে স্বস্তি ফেরানোই হবে নতুন সরকারের প্রথম বড় পরীক্ষা।
অন্যদিকে, শেখ হাসিনার শাসনামলে ভেঙে পড়া ব্যাংক খাত এবং স্থবির বিনিয়োগ পরিস্থিতি অর্থনীতিকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ থমকে আছে। বিএনপি নেতারাও স্বীকার করছেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পরই অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানো তাদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
চ্যালেঞ্জ ২: শক্তিশালী বিরোধী দল ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
এবারের সংসদে আওয়ামী লীগ নেই। রাজনৈতিক শূন্যতায় বিএনপির পুরোনো মিত্র জামায়াতে ইসলামী এবং জুলাই অভ্যুত্থানের তরুণদের দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) মিলে একটি শক্তিশালী বিরোধী জোট গঠন করেছে। জামায়াতের নেতৃত্বে এই ১১ দলীয় জোট ৭৭টি আসন (জামায়াত ৬৮, এনসিপি ৬ ও অন্যান্য ৩) পেয়েছে।
বিশ্লেষক সাঈদ ইফতেখার আহমেদ বিবিসিকে বলেন, “সংসদে এই শক্তিশালী বিরোধী জোটকে সামলানো এবং জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে তাদের চাপ মোকাবিলা করা বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।” এছাড়া আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে কতটা স্পেস দেওয়া হবে বা আদৌ হবে কি না, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন।
চ্যালেঞ্জ ৩: ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণ
নির্বাচনে বিএনপির জয়ে ভারত, পাকিস্তান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—সব পক্ষই অভিনন্দন জানিয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপির জয়ে সবচেয়ে বেশি স্বস্তি পেয়েছে ভারত। সাবেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, “ডানপন্থী বা ধর্মভিত্তিক দলগুলোর চেয়ে বিএনপি উদার মধ্যপন্থী দল হিসেবে পরিচিত। তাই ভারতের কাছে বিএনপি বেশি গ্রহণযোগ্য।”
তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক তৈরি এবং চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাটা হবে কঠিন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক ট্যারিফ চুক্তি এবং চীনের বিশাল বিনিয়োগের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করতে হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী অবশ্য আশাবাদী। তিনি বলেন, “সবার আগে বাংলাদেশ—এই নীতির ভিত্তিতেই আমরা পররাষ্ট্রনীতি সাজাব। কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের দিকে ঝুঁকে না পড়ে সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা হবে।”