সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও নির্বাচিতদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে এক মিশ্র চিত্র তুলে ধরেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির প্রতিবেদনে দেখা যায়, এবারের সংসদ সদস্যদের বড় অংশই নতুন মুখ এবং তুলনামূলক তরুণ হলেও সংসদে কোটিপতি ও ব্যবসায়ীদের আধিপত্য কমেনি, বরং বেড়েছে ঋণগ্রস্ত এমপির সংখ্যা। এছাড়া নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলেও মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়টিও উঠে এসেছে পর্যবেক্ষণে।
সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) রাজধানীর মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশকালে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এসব তথ্য তুলে ধরেন।
কোটিপতি ও ব্যবসায়ীদের সংসদ
টিআইবির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ৭৯.৪৬ শতাংশ অর্থাৎ ২৩৬ জনই কোটিপতি। এদের মধ্যে ১৩ জন শতকোটি টাকার মালিক। পেশার বিচারে সংসদে ব্যবসায়ীদের আধিপত্য এবারও অটুট; প্রায় ৬০ শতাংশ সংসদ সদস্যই পেশায় ব্যবসায়ী। যদিও দ্বাদশ সংসদের তুলনায় ব্যবসায়ীদের হার ৫ শতাংশ কমেছে, তবে নবম সংসদের তুলনায় তা ৩ শতাংশ বেড়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, পেশাদার রাজনীতিবিদের সংখ্যা আগের সংসদগুলোর তুলনায় এবার উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।
ঋণের রেকর্ড ও নারীর নিম্ন অংশগ্রহণ
প্রতিবেদনে জানানো হয়, নির্বাচিত এমপিদের অর্ধেকই ঋণগ্রস্ত। তাদের মোট দায়ের পরিমাণ ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা, যা গত চারটি সংসদের তুলনায় সর্বোচ্চ। দলগতভাবে বিএনপিতে ঋণগ্রস্ত এমপির হার ৬২ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামীতে ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব হতাশাজনক পর্যায়ে নেমে এসেছে। নারী সদস্যের হার মাত্র ২.৩৬ শতাংশ, যা ২০০৮ সালের পর সর্বনিম্ন।
তারুণ্য ও নতুন মুখের জয়জয়কার
এবারের সংসদকে ‘তুলনামূলক তরুণ’ হিসেবে অভিহিত করেছে টিআইবি। নির্বাচিতদের গড় বয়স ৫৯ বছর। প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ২০৯ জন, যা মোট সদস্যের প্রায় ৭০ শতাংশ। এমনকি সম্ভাব্য সংসদ নেতা এবং বিরোধীদলীয় নেতা—উভয়েই প্রথমবারের মতো সংসদে যাচ্ছেন, যা সংসদীয় রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকেও এই সংসদ এগিয়ে; ৮৪.৮৩ শতাংশই স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী।
আওয়ামী লীগের দ্বিমুখী অবস্থান
টিআইবির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত এবং ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করার পর দলটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ছিল ভিন্ন। টিআইবি জানায়, দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের একটি বড় অংশ কেবল ভোটেই অংশ নেননি, বরং নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বিএনপি, জামায়াত জোট বা জাতীয় পার্টির মতো প্রভাবশালী প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণাও চালিয়েছেন। ফলে দলগতভাবে বর্জন করলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা ছিল।
আচরণবিধি লঙ্ঘন ও ব্যয়ের উৎসব
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে টিআইবি। ৯৯ শতাংশ প্রার্থীই কোনো না কোনোভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন। নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা লঙ্ঘনে শীর্ষে রয়েছে বিএনপি (৩২৭.৫%), এরপর স্বতন্ত্র প্রার্থীরা (৩১৫.২%)। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরাও নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় করেছেন। টিআইবি অভিযোগ করে, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাংশের নিষ্ক্রিয়তার কারণে আচরণবিধি লঙ্ঘনের উৎসবে লাগাম টানা সম্ভব হয়নি।
জাল ভোট নিয়ে বিভ্রান্তি ও সতর্কবার্তা
এদিকে, নির্বাচনের জালিয়াতি নিয়ে টিআইবির তথ্য ভুলভাবে উপস্থাপনের বিষয়ে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবি স্পষ্ট করেছে যে, তাদের গবেষণায় ২১.৪ শতাংশ নমুনা আসনে জাল ভোটের ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। কিন্তু কোনো কোনো গণমাধ্যম একে ‘পুরো নির্বাচনে ২১.৪ শতাংশ জাল ভোট পড়েছে’ বলে প্রচার করছে—যা সম্পূর্ণ ভুল ও ভিত্তিহীন। এ বিষয়ে গণমাধ্যমগুলোকে দ্রুত সংশোধনী প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
টিআইবি সার্বিকভাবে নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক বললেও প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে ‘যেকোনো মূল্যে জেতার’ প্রবণতা এবং পেশিশক্তি ও অর্থের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।