ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রোজা বা উপবাস কেবল না খেয়ে থাকার কোনো রীতি ছিল না; এটি ছিল আত্মা ও দেহের পরিশুদ্ধির এক প্রাচীন রণকৌশল। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া থেকে নীল নদের তীর পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব বিশ্বাস অনুযায়ী রোজা পালন করত।
১. প্রাচীন মিশর: নীল নদের পবিত্রতা ও আত্মশুদ্ধি প্রাচীন মিশরীয়দের কাছে রোজা ছিল দেবতাদের অভিশাপ থেকে বাঁচার এক সুরক্ষা কবচ। তারা বিশ্বাস করত, দীর্ঘ উপবাসের মাধ্যমে শরীর থেকে ‘মন্দ আত্মা’ বের হয়ে যায়। পুরোহিতরা নীল নদের প্লাবনের আগে টানা ৪০ দিন পর্যন্ত উপবাস করতেন। সাধারণ মানুষও তিন দিনের বিশেষ রোজা রাখত, যেখানে তারা কেবল পানি ও শাকসবজি খেয়ে বেঁচে থাকত। এটি ছিল নীল নদের প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক অনন্য মাধ্যম।
২. প্রাচীন সাবীয় সভ্যতা (সাবিইন): আকাশের নক্ষত্র ও রোজা একটি স্বল্প পরিচিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো প্রাচীন সাবীয়দের রোজা। বর্তমান ইরাক ও সিরিয়া অঞ্চলে বসবাসকারী এই জাতি নক্ষত্র ও গ্রহের উপাসনা করত। তারা চাঁদের গতিবিধির ওপর ভিত্তি করে বছরে ৩০ দিন রোজা রাখত। মজার ব্যাপার হলো, তাদের এই ৩০ দিনের রোজার শেষে একটি বড় উৎসব পালন করা হতো, যা বর্তমানের ‘ঈদুল ফিতর’-এর ধারণার সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়। তারা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এই ব্রত পালন করত।
৩. পারস্যের জরথুস্ত্রবাদ ও ইয়াজিদি প্রথা জরথুস্ত্রবাদে যদিও কঠোর উপবাসকে নিরুৎসাহিত করা হতো (কারণ তাদের মতে সুস্থ শরীরই অন্ধকারের শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে), তবুও কুর্দি বংশোদ্ভূত ইয়াজিদিদের মধ্যে রোজার প্রথা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে তিন দিনের রোজা রাখে এবং বিশ্বাস করে যে এই তিন দিন স্বর্গীয় রহমত বর্ষিত হয়। এই রোজা শেষ হওয়ার পরের দিনটি তারা বিশাল আনন্দ উৎসবের মাধ্যমে পালন করে।
৪. ইহুদি ও খ্রিস্টধর্মের আধ্যাত্মিক উপবাস ইহুদিদের ‘ইয়োম কিপুর’ বা প্রায়শ্চিত্তের দিনটি এখনও সারা বিশ্বে পরিচিত। এই ২৬ ঘণ্টার উপবাসে তারা এমনকি পানি পান থেকেও বিরত থাকে। অন্যদিকে, খ্রিস্টধর্মে যিশু খ্রিস্টের মরুভূমিতে কাটানো ৪০ দিনের উপবাসকে স্মরণ করে ‘লেন্ট’ বা ৪০ দিনের ব্রত পালিত হয়। ক্যাথলিক থেকে শুরু করে অর্থোডক্স—প্রতিটি চার্চেই উপবাসের ধরণ আলাদা হলেও উদ্দেশ্য এক: ইন্দ্রিয় দমন ও বিনয় প্রকাশ।
৫. প্রাক-ইসলামী আরব: জাহেলিয়া যুগের রোজা ইসলাম পূর্ব আরবেও আশুরার দিনে (১০ই মহররম) কোরাইশরা রোজা পালন করত। এমনকি মক্কার মুশরিকদের মধ্যেও বিভিন্ন মানত পূরণের জন্য রোজা রাখার প্রচলন ছিল। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরতের পর দেখতে পান যে ইহুদিরাও মুসা (আ.)-এর বিজয়ের স্মরণে আশুরার রোজা রাখছে। পরবর্তীতে ২য় হিজরীতে পবিত্র রমজান মাসের রোজা মুসলমানদের জন্য বাধ্যতামূলক বা ফরজ করা হয়।
প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যের রোজা সংস্কৃতির তুলনামূলক চিত্র
| সভ্যতা/ধর্ম | রোজার ধরণ ও সময় | মূল বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| প্রাচীন মিশরীয় | ৩ থেকে ৭০ দিন | দেবতাদের নৈকট্য ও নীল নদের উৎসবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। |
| প্রাচীন সাবীয় | টানা ৩০ দিন | নাক্ষত্রিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পালন এবং শেষে উৎসব উদযাপন। |
| ইয়াজিদি ধর্ম | ৩ দিন (মঙ্গলবার-বৃহস্পতিবার) | সৌর ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত। |
| ইহুদি ধর্ম | ২৬ ঘণ্টা (ইয়োম কিপুর) | পাপের প্রায়শ্চিত্ত ও তাওরাত প্রাপ্তির মহিমা স্মরণ। |
| খ্রিস্টধর্ম | ৪০ দিন (লেন্ট) | যিশুর মরুভূমির দুঃখকষ্টকে স্মরণ ও প্রার্থনা। |