সরকারি ভাষ্যমতে দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই, অথচ সারা দেশের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিদিন পেট্রল পাম্পগুলোর সামনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি এবং ক্রেতাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার চরম ভোগান্তি প্রমাণ করে যে সরবরাহ ব্যবস্থায় মারাত্মক গলদ রয়েছে। অনেক পাম্পে তেলের অভাবে ‘বিক্রি বন্ধ’ নোটিশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই বিপরীতমুখী পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে অবৈধ মজুতদার এবং অসাধু পাম্প মালিকদের সিন্ডিকেটের কারসাজিকে দায়ী করা হচ্ছে। সরবরাহ না পাওয়ার আতঙ্কে সাধারণ মানুষও প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কিনে জমা করছেন, যা সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। তবে আশার কথা হলো, দেশব্যাপী প্রশাসনের সাম্প্রতিক ঝটিকা অভিযানে ইতোমধ্যে ৬৪ হাজার লিটার অবৈধ তেল উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘবে এই কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের লাগাম টেনে ধরার কোনো বিকল্প নেই।
দেশীয় এই চরম অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও আমাদের জ্বালানি খাতকে গভীর খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে ইরানকেন্দ্রিক চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে এবং ব্যারেলপ্রতি দাম ২০০ ডলার ছুঁতে পারে বলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্পট মার্কেট থেকে এখন দ্বিগুণ দামে এলএনজি কিনতে বাধ্য হচ্ছে বাংলাদেশ। বর্তমানের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য অতীতের সরকারগুলোর চরম অবহেলা ও অদূরদর্শিতাই প্রধানত দায়ী। বিগত সাড়ে পনেরো বছরের স্বৈরাচারী শাসন এবং তৎপরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে দেশের জরুরি মুহূর্তের জন্য ন্যূনতম জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা হয়নি। মূলত লুটপাটের উদ্দেশ্যে খাতটিকে পুরোপুরি আমদানিনির্ভর করে তোলার কারণেই আজকে রাষ্ট্রকে এমন গভীর সংকটের মুখে পড়তে হয়েছে।
সদ্য দায়িত্ব নেওয়া বর্তমান সরকার এই অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়ের মুখে পড়ে শিল্প, কৃষি ও পরিবহন খাত সচল রাখতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, বৈশ্বিক বাজার থেকে বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে গিয়ে চলতি অর্থবছরেই সরকারকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি গুনতে হতে পারে। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়েছে। তেলের ডিপোগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে এবং পাম্পগুলোর কারসাজি রোধে তদারকির জন্য ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী রেশনিং ব্যবস্থাও বাতিল করা হয়েছে। মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট ও চোরাচালান কঠোর হস্তে দমনের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে যে নির্দেশ দিয়েছেন, মাঠপর্যায়ে তার দ্রুত ও দৃশ্যমান বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
জ্বালানি নিরাপত্তা মূলত কোনো দেশের জাতীয় নিরাপত্তারই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। মার্কিন রেটিং সংস্থা এসঅ্যান্ডপি তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে যে, অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে মারাত্মক ঝুঁকিতে অবস্থান করছে। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থেই এই ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করা অপরিহার্য। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর একক নির্ভরশীলতা কমিয়ে জ্বালানি আমদানির নতুন ও বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে। সবচেয়ে বেশি জরুরি হলো, দেশের নিজস্ব খনিজ সম্পদের সর্বোচ্চ অনুসন্ধান, উত্তোলন ও ব্যবহার নিশ্চিত করে জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে হাঁটা। তা না হলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের যেকোনো সংঘাত বা অস্থিরতায় দেশের অর্থনীতি এভাবেই বারবার জিম্মি হয়ে পড়বে।