মেধা, সততা ও দক্ষতাকে মাপকাঠি ধরে জনপ্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান বিএনপি সরকার। নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় ও মাঠ প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল শুরু হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে নতুন এপিডি, ১১টি জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং ৯ জন নতুন সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে বিগত ১৭ বছর এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বৈষম্যের শিকার কর্মকর্তাদের দাবি, প্রশাসনে এখনো ‘সুবিধাভোগী’ ও একটি বিশেষ সিন্ডিকেটের আধিপত্য রয়ে গেছে, যা নিয়ে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।
বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ (এপিডি) অনুবিভাগ। প্রায় চার মাস শূন্য থাকার পর এই পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সদ্য অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদোন্নতি পাওয়া মো. আকনুর রহমানকে।
অন্যদিকে, মাঠ প্রশাসনে গতি আনতে ১১ জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পূর্ববর্তী ডিসিদের প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ডিসিরা হলেন:
রাজশাহী: কাজী শহিদুল ইসলাম (উপসচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়)
চুয়াডাঙ্গা: লুৎফুন নাহার (উপসচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়)
খুলনা: হুরে জান্নাত (উপসচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ)
মাদারীপুর: মর্জিনা আক্তার (উপসচিব, অর্থ বিভাগ)
ব্রাহ্মণবাড়িয়া: মো. আবু সাঈদ (উপপরিচালক, সরকারি প্রিন্টিং প্রেস)
চাঁদপুর: আহমেদ জিয়াউর রহমান (উপসচিব, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ)
হবিগঞ্জ: জি এম সরফরাজ (উপসচিব, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ)
নরসিংদী: ইসরাত জাহান কেয়া (উপসচিব, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়)
মেহেরপুর: শিল্পী রানী রায় (উপসচিব, সংস্কৃতি-বিষয়ক মন্ত্রণালয়)
লালমনিরহাট: মুহ. রাশেদুল হক প্রধান (উপসচিব, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড)
বান্দরবান: মো. সানিউল ফেরদৌস (উপপ্রকল্প পরিচালক, ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন)
সরকার গঠনের পরপরই সচিব পর্যায়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিগত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে কর্মরত বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন ৯ জনকে সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত সচিবরা হলেন:
মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়: মো. দেলোয়ার হোসেন
জাতীয় সংসদ সচিবালয়: ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া
বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন: মিস ফাহমিদা আখতার এনডিসি
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ: কাজী আনোয়ার হোসেন
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ: জাকারিয়া
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন: মোহা. রায়হান কাওছার
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান: মো. মোখতার আহমেদ
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়: মিস ইয়াসমীন পারভীন এনডিসি
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি): এস এম এবাদুর রহমান (চুক্তিভিত্তিক)
এছাড়া, সিনিয়র সচিব নিয়ামত উল্ল্যাহ ভূঁইয়া ও নাসরিন জাহানকে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য এবং কানিজ মাওলাকে আইএমইডি-তে পদায়ন করা হয়েছে।
সরকার প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করলেও ভেতরে ভেতরে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যারা সুবিধাভোগী ছিলেন, তারাই এখন ভোল পাল্টে বর্তমান সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট হচ্ছেন।
বঞ্চিত কর্মকর্তাদের প্রধান অভিযোগের তীর প্রশাসনের ‘৮২ ব্যাচের নেটওয়ার্ক’-এর দিকে। অভিযোগ রয়েছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বর্তমান সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি এই সিন্ডিকেটের অন্যতম নিয়ন্ত্রক। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অবসরের এক দশক পর তিনি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান। অভিযোগ উঠেছে, তিনি নিজের প্রভাব খাটিয়ে ‘লটারি পদ্ধতি’র নামে ৬৪ জেলায় সাজানো প্রক্রিয়ায় এসপি নিয়োগ দিয়েছেন, যেখানে জামায়াত ঘরানার কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ মত: বিএনপিপন্থি সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর নতুন এই নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে কিছুটা সমালোচনা করেছেন। তিনি জানান, একসঙ্গে নিয়োগ পাওয়া ৯ জন সচিবের মধ্যে মাত্র ৬ জন প্রশাসন ক্যাডারের এবং ২ জন বিলুপ্ত ইকোনমিক ক্যাডারের। ইকোনমিক ক্যাডার থেকে এভাবে সচিব পদে নিয়োগ দেওয়াকে তিনি প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য সমীচীন নয় বলে মন্তব্য করেছেন। তবে তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রশাসন সংস্কারের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন।
সব মিলিয়ে, যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রশাসন পুনর্গঠনের কথা বলা হলেও, গভীরে থাকা দুষ্টচক্র ও সুবিধাভোগীদের প্রভাবমুক্ত করা বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।