মিয়ানমারের সামরিক জান্তা, পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এবং রাখাইন স্টেটের বর্তমান পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই অঞ্চলে এক জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে। একদিকে চীন ও রাশিয়ার সরাসরি মদদপুষ্ট মিয়ানমার সরকার, অন্যদিকে তাদের হটাতে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের আভাস। এই দুই পরাশক্তির লড়াইয়ের মাঝখানে পড়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন ও বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য এটি একটি বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
মিয়ানমারে সামরিক জান্তা তিন ধাপে (২৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১ জানুয়ারি ২০২৬ এবং জানুয়ারির শেষে) যে নির্বাচন করেছে, বিশ্বজুড়ে তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে শুরু করে জাতিসংঘ—সবাই এটিকে জান্তার ‘সাজানো খেলা’ বলে আখ্যা দিয়েছে। এর কারণগুলো সুস্পষ্ট:
প্রধান বিরোধী দল নিষিদ্ধ: অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিকে (NLD) নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সেনাবাহিনীর আধিপত্য: সংবিধান অনুযায়ী পার্লামেন্টের ২৫ শতাংশ আসন সরাসরি সামরিক বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত।
ভোটহীন এলাকা: বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকা দেশের প্রায় ২০ শতাংশ এলাকায় কোনো ভোটই হয়নি।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার টম অ্যান্ড্রুজ আগেই বলেছিলেন, এই নির্বাচনের ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত। শেষ পর্যন্ত কাউকে সুযোগ না দিয়ে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং নিজেই রাষ্ট্রপতির পদে বসেছেন এবং সেনাবাহিনীর দায়িত্ব দিয়েছেন তার বিশ্বস্ত জেনারেল সোয়ে উইনকে। এর অর্থ হলো, সামরিক শাসন এখন বেসামরিক সরকারের ছদ্মবেশ ধারণ করেছে মাত্র।
মার্কিন আপত্তির তোয়াক্কা না করে মিয়ানমার সরকার টিকে আছে মূলত চীন ও রাশিয়ার জোরালো সমর্থনে।
রাশিয়ার সামরিক প্রযুক্তি: সম্প্রতি মিয়ানমার বিমান বাহিনীতে যুক্ত হয়েছে রাশিয়ার তৈরি SU-30 যুদ্ধবিমান। শুধু তাই নয়, রাশিয়ার স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ‘গ্লোনাস’ (GLONASS)-এর গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপনের চুক্তিও হয়েছে। এর ফলে মার্কিন জিপিএসের ওপর নির্ভর না করে মিয়ানমারের জান্তা সরকার দেশের ভেতরে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে নির্ভুল মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালাতে সক্ষম হবে।
চীনের কৌশলগত বিজয়: অন্যদিকে, চীন মিয়ানমারের কিয়াউকপিউ (Kyaukphyu) গভীর সমুদ্রবন্দরের ৭০ শতাংশ মালিকানা নিশ্চিত করেছে। এর মাধ্যমে চীন মালাক্কা প্রণালী বাইপাস করে সরাসরি মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আফ্রিকায় প্রবেশের পথ তৈরি করে নিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল কৌশলগত ধাক্কা।
চীন ও রাশিয়ার এই আগ্রাসী আধিপত্য মেনে নেবে না যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কংগ্রেসে ‘বার্মা অ্যাক্ট’ পাস হয়েছে এবং সিনেটে আলোচনা চলছে। তবে ইরান বা মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকায় যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারে সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে না। বরং কৌশল হিসেবে তারা মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে হটাতে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে (যেমন: আরাকান আর্মি, যারা রাখাইনের প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা দখল করে আছে) মদদ যোগাতে পারে।
পুরো সমীকরণের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি হলো বাংলাদেশের অবস্থান। রাখাইন স্টেটের আরাকান আর্মির সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি সীমান্ত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি আরাকান আর্মিকে সামরিক বা লজিস্টিক সহায়তা দিতে চায়, তবে কৌশলগত কারণে তারা বাংলাদেশ ভূখণ্ড ব্যবহার করতে চাইতে পারে বা বাংলাদেশকে পাশে চাইবে। এখানেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ: ১. সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হওয়ার শঙ্কা: মার্কিন সহায়তা কার্যক্রমে জড়ালে বাংলাদেশ সরাসরি চীন ও মিয়ানমার সরকারের বিরাগভাজন হবে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। ২. কূটনৈতিক ভারসাম্য: যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সামলানো বাংলাদেশের জন্য কঠিন হবে।
তারেক রহমান কি ট্রাম্পের মন রাখতে পারবেন? ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন যখন এশিয়ায় চীনের প্রভাব খর্ব করতে চাইবে, তখন তারা মিত্রদের ওপর চাপ প্রয়োগ করবে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বকে (যেমন তারেক রহমান বা ক্ষমতাসীনদের) এখানে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলতে হবে। একদিকে মার্কিন প্রশাসনের ভূ-রাজনৈতিক চাহিদাকে সামলানো (তাদের মন রাখা), অন্যদিকে চীন-রাশিয়ার মতো পরাশক্তির রোষানল থেকে দেশকে বাঁচিয়ে নিজস্ব সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখা—এটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কঠিন এক কূটনৈতিক পরীক্ষা।
মিয়ানমারের এই ছায়াযুদ্ধে বাংলাদেশ কোনোভাবেই যেন ব্যবহার না হয়, সেদিকে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন।