মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্র এখন নতুন এক ভয়াবহ মোড় নিচ্ছে। দক্ষিণ লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযানের জন্য সম্পূর্ণ নতুন একটি রণপরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। মঙ্গলবার জেনারেল স্টাফ ফোরামের এক রুদ্ধদ্বার ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই ভবিষ্যৎ যুদ্ধ-কৌশল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করা হয়। দক্ষিণ লেবাননের বেত লিফ এলাকায় মোতায়েন করা আইডিএফ-এর ১৬২তম ডিভিশন পরিদর্শনের সময় এই বিস্ফোরক ঘোষণা দেন ইসরায়েলি সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির। তিনি জানান, প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেই লেবানন ও ইরান—এই উভয় ফ্রন্টের জন্য পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপগুলো নিখুঁতভাবে সাজানো হয়েছে।
নতুন এই সামরিক ব্লু-প্রিন্টে সবচেয়ে বেশি আগ্রাসী মনোযোগ দেওয়া হয়েছে ইরানের ওপর। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সাম্প্রতিক যৌথ সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গ টেনে জেনারেল জামির দাবি করেন, ওই হামলায় তারা ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছেন এবং তেহরানকে চরমভাবে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের অত্যন্ত সুরক্ষিত সামরিক ও রাডার স্থাপনাগুলোতে আঘাত হেনেছিল, যার ফলে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এখন ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য হলো ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করতে না পারে। একই সঙ্গে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালিতে তেহরান যেন কোনো কৌশলগত সুবিধা আদায় করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতেও বদ্ধপরিকর তেল আবিব। ইসরায়েলি সেনাপ্রধান চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, তাদের বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমানগুলো সম্পূর্ণ প্রস্তুত ও সশস্ত্র অবস্থায় অপেক্ষা করছে এবং মুহূর্তের নোটিশে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুগুলোতে বিধ্বংসী হামলা চালানোর জন্য টার্গেট সিস্টেম আগে থেকেই লোড করা আছে।
অন্যদিকে লেবানন সীমান্তেও বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি নয় ইসরায়েল। গত মাসে সংঘাত নতুন করে বৃদ্ধি পাওয়ার পর থেকে আইডিএফ-এর নিরবচ্ছিন্ন হামলায় হিজবুল্লাহর অন্তত ১ হাজার ৭০০ জনের বেশি সশস্ত্র সদস্য নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছেন জেনারেল জামির। সংগঠনের শীর্ষ ও মাঠপর্যায়ের যোদ্ধাদের এই বিপুল প্রাণহানি হিজবুল্লাহর কমান্ড কাঠামোর জন্য এক অভাবনীয় ধাক্কা। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করে তুলতে ইসরায়েলি সেনাপ্রধান দক্ষিণ লেবাননের সীমান্ত থেকে শুরু করে লিতানি নদী পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাকে হিজবুল্লাহর জন্য ‘মৃত্যুপুরী’ বা কিলিং জোন হিসেবে গড়ে তোলার সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৬ সালের জাতিসংঘের ১৭০১ নম্বর প্রস্তাবনা অনুযায়ী হিজবুল্লাহকে লিতানি নদীর ওপারে সরিয়ে দেওয়ার যে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে, ইসরায়েল এখন ধ্বংসাত্মক সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে সেটিই জোরপূর্বক বাস্তবায়ন করতে চাইছে। সব মিলিয়ে, অত্যন্ত উচ্চ স্তরের প্রস্তুতিতে থাকা ইসরায়েলি বাহিনীর এই দ্বিমুখী ও আগ্রাসী রণপ্রস্তুতি গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে আরও একটি দীর্ঘস্থায়ী ও সর্বনাশা আঞ্চলিক যুদ্ধের খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বলে আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক বিশ্ব।