গাজায় চলমান ভয়াবহ মানবিক সংকটের মধ্যেই ইসরায়েলের কাছে কোটি কোটি ডলার মূল্যের প্রাণঘাতী অস্ত্র ও সশস্ত্র বুলডোজার বিক্রি আটকে দেওয়ার একটি উদ্যোগ মার্কিন সিনেটে ব্যাপকভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। তবে এই ভোটাভুটির মাধ্যমে মার্কিন কংগ্রেসে এবং বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরে ইসরায়েল নীতি নিয়ে যে তীব্র বিভাজন রয়েছে, তা আরও একবার প্রকাশ্যে এল।
কী ছিল স্যান্ডার্সের এই প্রস্তাবগুলোতে?
স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স মূলত তিনটি পৃথক প্রস্তাব (Joint Resolutions of Disapproval) উত্থাপন করেছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল বাইডেন প্রশাসনের অনুমোদিত বিপুল অংকের অস্ত্র বিক্রি আটকে দেওয়া। এই অস্ত্র চুক্তির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল:
জেডিএএম (JDAM) বা সাধারণ বোমাকে স্মার্ট বোমায় পরিণত করার কিট।
উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ট্যাংক ও মর্টারের গোলা।
বিতর্কিত আর্মার্ড বা সশস্ত্র বুলডোজার (যা গাজা ও পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ধ্বংস এবং সামরিক অভিযানে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে)।
স্যান্ডার্সের যুক্তি ছিল, মার্কিন অস্ত্র ব্যবহার করে গাজায় হাজার হাজার বেসামরিক নারী ও শিশু হত্যা করা হচ্ছে, যা মার্কিন ও আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।
প্রস্তাব বাতিলের নেপথ্যে হোয়াইট হাউস ও রিপাবলিকানরা
এই প্রস্তাবগুলো পাস হওয়ার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা আগে থেকেই ছিল না। বাইডেন প্রশাসন এই প্রস্তাবগুলো আটকাতে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের ওপর ব্যাপক লবিং করে। প্রস্তাবের বিরোধিতাকারীদের প্রধান যুক্তি ছিল—হামাস, হিজবুল্লাহ এবং ইরানের মতো চতুর্মুখী শত্রুর বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার জন্য ইসরায়েলের এই অস্ত্রগুলো অত্যন্ত জরুরি। প্রায় সকল রিপাবলিকান সিনেটর একযোগে এই প্রস্তাবগুলোর তীব্র বিরোধিতা করেন।
বুলডোজার বিক্রি: ডেমোক্র্যাট শিবিরের ফাটল ও চাক শুমারের অবস্থান
বোমা বিক্রির প্রস্তাবগুলো বিশাল ব্যবধানে বাতিল হলেও, ‘সশস্ত্র বুলডোজার’ বিক্রির প্রস্তাবটিতে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরীণ বিভাজন সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পক্ষে ভোট: ৪৭ জন ডেমোক্র্যাটিক সিনেটরের মধ্যে ৪০ জনই বুলডোজার বিক্রি আটকে দেওয়ার পক্ষে (স্যান্ডার্সের প্রস্তাবে সমর্থন) ভোট দেন। এমনকি অ্যারিজোনার সিনেটর মার্ক কেলি, যিনি এর আগে স্যান্ডার্সের এমন উদ্যোগের বিরোধিতা করতেন, তিনিও এবার নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের ‘বেপরোয়া সিদ্ধান্তের’ সমালোচনা করে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন।
বিপক্ষে ভোট: তবে, সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের শীর্ষ নেতা চাক শুমার এই প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নেন। শুমার ছাড়াও রিচার্ড ব্লুমেন্থাল, ক্রিস কুনস, ক্যাথরিন কর্তেজ মাস্তো, জন ফেটারম্যান, কার্স্টেন গিলিব্র্যান্ড এবং জ্যাকি রোজেনের মতো ডেমোক্র্যাট সিনেটররা প্রস্তাবের বিপক্ষে (ইসরায়েলের পক্ষে) ভোট দিলে এটি বাতিল হয়ে যায়।

তৃণমূল বনাম শীর্ষ নেতৃত্ব
ভোটের এই ফলাফল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির শীর্ষ নেতৃত্ব এবং তৃণমূল সমর্থকদের মধ্যকার বিস্তর ব্যবধানকে সামনে এনেছে। কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা যায়, ৭৫ শতাংশ ডেমোক্র্যাট সমর্থক গাজায় ইসরায়েলের এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের জন্য আর কোনো সামরিক সহায়তা পাঠানোর ঘোর বিরোধী।
দলের এই ৮০ শতাংশের বেশি সিনেটরের সমর্থন পাওয়াকে একটি বড় ‘অগ্রগতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বার্নি স্যান্ডার্স। তিনি বলেন, “আজ ডেমোক্র্যাটিক ককাসের বিশাল অংশ আমেরিকান জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং নেতানিয়াহুর ভয়াবহ ও অবৈধ যুদ্ধের জন্য মার্কিন সামরিক সহায়তা আটকে দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।”
সংক্ষেপে, সিনেটের এই ভোটাভুটি প্রমাণ করে যে, উচ্চপর্যায়ে ইসরায়েলের প্রতি শর্তহীন সমর্থন এখনও জোরালো থাকলেও, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মূল ভিত্তির মধ্যে ক্ষোভ ও পরিবর্তনের হাওয়া ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে।