যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের চলমান সামরিক সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া অস্থিরতা বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তায় এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। পরিস্থিতি দ্রুত কূটনৈতিকভাবে সামাল দেওয়া না গেলে বিশ্বজুড়ে তীব্র ক্ষুধার মুখে থাকা মানুষের সংখ্যা অভাবনীয় হারে বেড়ে যাবে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের স্প্রিং মিটিংয়ের (বসন্তকালীন বৈঠক) ফাঁকে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই ভয়াবহ সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিল।
৩০ কোটি মানুষের সংকট আরও প্রকট হওয়ার শঙ্কা
ইন্দরমিত গিল বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, কোভিড মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন করে মধ্যপ্রাচ্য সংকট বৈশ্বিক অর্থনীতিকে খাদের কিনারায় নিয়ে যাচ্ছে। তিনি পরিসংখ্যান দিয়ে জানান, “বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ আগে থেকেই তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় (Acute food insecurity) ভুগছেন।”
তিনি সতর্ক করেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের ‘নক-অন ইফেক্ট’ (Knock-on effects) বা চেইন রিঅ্যাকশনের কারণে এই সংখ্যাটি খুব দ্রুতই আরও অন্তত ২০ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে নতুন করে আরও প্রায় ৬ কোটি মানুষ সরাসরি অনাহার ও ক্ষুধার চরম ঝুঁকিতে পড়বে।
কেন এই সংকট আসন্ন এবং এর প্রভাব কখন পড়বে?
সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সাথে বিশ্বজুড়ে খাবারের দাম বা সংকটের কী সম্পর্ক। অর্থনীতিবিদ গিল এর একটি পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “এখন বিশ্ববাজারে যে খাদ্যশস্য বা খাবার পাওয়া যাচ্ছে, তা আগে থেকেই উৎপাদিত।” অর্থাৎ, এই মুহূর্তে বাজারে খাবারের চরম ঘাটতি চোখে না পড়লেও, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর যুদ্ধের আসল প্রভাবটি টের পাওয়া যাবে আর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই।
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যাবে। তেলের দাম বাড়লে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ব্যয়, কৃষি উৎপাদনের খরচ এবং সারের দাম বহুগুণ বেড়ে যায়। এর ফলে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে কারা?
বিশ্বব্যাংকের এই শীর্ষ অর্থনীতিবিদ জানান, উন্নত দেশগুলো এই ধাক্কা কিছুটা সামলে নিতে পারলেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলো। বিশেষ করে:
যেসব দেশে বর্তমানে গৃহযুদ্ধ বা সংঘাত চলছে।
যেসব দেশের সরকারি ও প্রশাসনিক কাঠামো অত্যন্ত ভঙ্গুর।
যেসব দেশ খাদ্যশস্য ও জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
ইন্দরমিত গিল চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতায় যদি শিগগিরই এই সংঘাতের কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান না হয়, তবে এই ভঙ্গুর দেশগুলোতে ব্যাপক হারে দুর্ভিক্ষ বা ক্ষুধা হানা দেওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, বিশ্বব্যাংকের এই সতর্কতা প্রমাণ করে যে, আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ শুধু রণক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং হাজার মাইল দূরের দরিদ্র মানুষের প্লেটের খাবারও কেড়ে নেয়। এই বৈশ্বিক দুর্ভিক্ষ এড়াতে বিশ্বনেতাদের এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।