বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৫ অপরাহ্ন

মক্কার আকাশসীমায় হুথিদের ড্রোন ভূপাতিত

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৮ বার
প্রকাশ: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও উত্তেজনার পারদ আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিল ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথি বিদ্রোহীর দল । বিশ্বের কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানের আবেগ, বিশ্বাস ও সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার পবিত্রতম কেন্দ্র মক্কা নগরীকে লক্ষ্যবস্তু করে ড্রোন হামলা চালানোর এক দুঃসাহসিক চেষ্টা করেছে ইরান-সমর্থিত এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী । তবে মক্কার পবিত্র আকাশসীমায় প্রবেশের ঠিক আগমুহূর্তেই অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সেই ড্রোনটিকে মাঝপথেই ধ্বংস করে দিয়েছে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী । মঙ্গলবার সৌদি আরবের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে মক্কা নগরীর দক্ষিণাংশে এই ড্রোনটি ভূপাতিত করার ঘটনা ঘটে । এই ঘটনাটিকে সৌদি আরব এবং ইয়েমেনে বৈধ সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত আরব জোট অত্যন্ত চরম একটি উসকানিমূলক পদক্ষেপ এবং সংঘাতের বড় ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবেই বিবেচনা করছে ।
বুধবার ভোরে গণমাধ্যমের কাছে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক ও কড়া বিবৃতিতে আরব জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালকি এই ড্রোন হামলার অপচেষ্টাকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় নিন্দা জানিয়েছেন । তিনি হুথিদের এই পদক্ষেপকে সুস্পষ্টভাবে একটি ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা লঙ্ঘন বলে আখ্যায়িত করেছেন । সামরিক ও কূটনৈতিক পরিভাষায় ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করার অর্থ হলো এমন এক পর্যায়, যার পর কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প অবশিষ্ট থাকে না । জেনারেল মালকি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন যে, এই ধরনের ন্যক্কারজনক হামলার জবাবে প্রয়োজনীয় যেকোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আরব জোট বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না । পবিত্র নগরীর নিরাপত্তায় যেকোনো ধরনের ছাড় দিতে যে সৌদি আরব নারাজ, এই বিবৃতির মাধ্যমে মূলত সেই কঠোর বার্তাই বিশ্ববাসীকে দেওয়া হয়েছে ।
মক্কা নগরী সমগ্র বিশ্বের ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে কেবল একটি শহরই নয়, বরং এটি তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ ও পবিত্রতম তীর্থস্থান । ইসলামের প্রধান কেন্দ্র এবং পবিত্র কাবা শরিফের অবস্থান এই শহরে হওয়ায় প্রতিবছর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মুসলমান হজ ও ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সেখানে সমবেত হন । মুসলমানদের হৃদয়ের স্পন্দন এই পবিত্র ভূমিতে হামলার চেষ্টা স্বভাবতই বিশ্বজুড়ে এক তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় তুলেছে । আরব জোটের বিবৃতিতে হুথিদের এই অপতৎপরতাকে একটি চরম ‘লজ্জাজনক কাজ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে । বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে যে, ওহি নাজিলের পবিত্র ভূমি এবং বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের হৃদয়ের পরম গন্তব্যস্থলকে লক্ষ্যবস্তু করার এই হীন চেষ্টা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না । ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটির এই ধরনের অপরিণামদর্শী আচরণ সমগ্র মুসলিম উম্মাহর আবেগে চরম আঘাত হেনেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা ।
তবে ঐতিহাসিকভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মক্কার আশপাশে বা পবিত্র নগরীটির দিকে তাক করে হুথিদের এই ধরনের আকাশপথে হামলার ঘটনা এবারই প্রথম নয় । ইয়েমেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রেক্ষাপটে এর আগেও এমন ধৃষ্টতা দেখিয়েছে তারা । আরব জোটের দেওয়া পরিসংখ্যান ও তথ্য অনুযায়ী, আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগে ২০১৭ সালেও ঠিক একইভাবে মক্কার দিকে হুথিদের ছোড়া একটি ভয়ংকর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে ভূপাতিত করেছিল সৌদি আরবের চৌকস আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী । জোটের পক্ষ থেকে সে সময় জানানো হয়েছিল যে, পবিত্র মক্কা নগরীতে আঘাত হানার আগেই তায়েফ প্রদেশের আল-ওয়াসলিয়া এলাকার আকাশে সেই ক্ষেপণাস্ত্রটিকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল । ওই ঘটনায় সেবার কোনো ধরনের হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি, যা মূলত সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রবল সক্ষমতারই প্রমাণ দেয় ।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হুথি বিদ্রোহীদের হামলার মাত্রা ও তীব্রতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে । মঙ্গলবার মক্কার দিকে ড্রোন পাঠানোর ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ গত সোমবারও সৌদি আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে তারা । এদিন খামিস মুশাইত, আবহা এবং তায়েফ শহরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক এলাকাগুলো লক্ষ্য করে হুথিদের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৩ জন নিরপরাধ মানুষ আহত হন । সামরিক স্থাপনার বদলে সাধারণ মানুষের বাসযোগ্য এলাকাকে লক্ষ্যবস্তু করার এই প্রবণতা আন্তর্জাতিক যুদ্ধনীতির চরম লঙ্ঘন এবং এটি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে ।
হুথিদের এই ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম কেবল চলতি সপ্তাহেই সীমাবদ্ধ নেই । এর ঠিক আগের সপ্তাহেও সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর ও অঞ্চলে হুথিদের ধারাবাহিক ও নির্বিচার হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ৭০ জনের বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছিলেন । শিশু ও নারীদের ওপর এই হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যে, সংঘাতে বেসামরিক নাগরিকদের জানমালের কোনো তোয়াক্কাই করছে না ইয়েমেনের এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী । তাদের একের পর এক ছোঁড়া ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য এক ধারাবাহিক উপদ্রব হয়ে দাঁড়িয়েছে ।
বেসামরিক জীবনের পাশাপাশি সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি অবকাঠামোকেও অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে হুথিরা । এর একটি বড় প্রমাণ মেলে গত শুক্রবারের হামলার ঘটনায় । এদিন রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে সৌদি আরবের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ তেল পাইপলাইন লক্ষ্য করে কয়েকটি সমন্বিত ড্রোন হামলা চালানো হয় । বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে এই পাইপলাইনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । ড্রোন হামলার পরপরই সতর্কতা ও নিরাপত্তার স্বার্থে বাধ্য হয়ে কর্তৃপক্ষকে ওই পাইপলাইনটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে হয় । এই ঘটনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছিল এবং সৌদি আরবের অর্থনীতিতে আঘাত হানার একটি সুস্পষ্ট পাঁয়তারা হিসেবেই ঘটনাটিকে বিবেচনা করা হয়েছে ।
তেল পাইপলাইন ও বেসামরিক এলাকায় চালানো এই ধারাবাহিক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ এবং মুসলিম বিশ্বের নানা আন্তর্জাতিক সংস্থা । আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মিত্র দেশগুলো এই সংকটময় মুহূর্তে সৌদি আরবের প্রতি তাদের জোরালো সমর্থন ও পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছে । তারা জোর দিয়ে বলেছে যে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং পবিত্র স্থানগুলোর পবিত্রতা রক্ষায় সৌদি আরবের যেকোনো আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ গ্রহণের পূর্ণ অধিকার রয়েছে । সব মিলিয়ে ইয়েমেন-সৌদি সীমান্তের এই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং মক্কার মতো পবিত্র স্থানকে হামলার লক্ষ্যবস্তু বানানোর এই অপচেষ্টা অদূর ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে আরও বড় কোনো রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জন্ম দেয় কি না, সেটাই এখন আন্তর্জাতিক মহল ও বিশ্লেষকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ।


এ জাতীয় আরো খবর...