শিরোনামঃ
ইরানের আকাশসীমা দখলে নিচ্ছে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র, স্থলপথে নামল হাজারো কুর্দি যোদ্ধা ঘুমের মধ্যে ঘাম হওয়া কি কোনো রোগের লক্ষণ? সভাপতি বুলবুল বিদেশে, দায়িত্ব না থাকায় অস্থিরতা বাড়ছে বিসিবিতে ঈদের ছুটিতে কালবৈশাখীর চোখরাঙানি: ১৬-১৮ মার্চ বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টির প্রবল শঙ্কা ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত ইরানের জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার কবরে মার্কিন প্রতিনিধির শ্রদ্ধা ‘হেয়ার কাট’ বাতিলের দাবিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে বিক্ষোভ: আমানতকারীদের ওপর পুলিশের জলকামান অফিস তালাবদ্ধ রেখে লাপাত্তা: ভূমি প্রতিমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনে ধরা খেয়ে ৩ কর্মকর্তা বদলি মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে এনসিপির বৈঠক স্থগিত বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নরের নিয়োগ বাতিলের দাবি টিআইবির
বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬, ০৩:১৪ অপরাহ্ন

জাতীয় মসজিদের পবিত্র মিম্বরে যখন দুর্নীতির ছায়া

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন / ১৩ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০২৬

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম এবং চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ—এগুলো কেবল ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও জনমত গঠনের শক্তিশালী কেন্দ্র। কিন্তু সম্প্রতি স্টার নিউজের এক চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, এই পবিত্র মিম্বরে আসীন বেশ কয়েকজন ইমামের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ঘটেছে নজিরবিহীন জালিয়াতি, তথ্য গোপন এবং দুর্নীতির মহোৎসব। সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার এই পদগুলো পেতে বয়স কমানো থেকে শুরু করে ভুয়া সার্টিফিকেট দাখিল—সবই করা হয়েছে ক্ষমতার দাপটে।

মাওলানা মিজানুর রহমান: বয়স জালিয়াতি ও বিধি বহির্ভূত পদোন্নতি

বায়তুল মোকাররমের বর্তমান সিনিয়র পেশ ইমাম মাওলানা মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি হলো বয়স জালিয়াতি।

  • তিন বছর বয়স হ্রাস: নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাত্র ছয় দিন পর তিনি নিজের বয়স তিন বছর কমিয়ে আবেদন করেন।

  • অতিরিক্ত নম্বর: যেসকল সার্টিফিকেট কোর্সের জন্য কোনো নম্বর বরাদ্দ ছিল না, সেখানেও তাকে অবৈধভাবে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া হয়েছে।

  • স্বার্থের সংঘাত: নিয়োগ বোর্ডে তার নিকটাত্মীয় থাকার বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন করা হয়।

  • বেতন বৈষম্য: তদন্ত রিপোর্টে দেখা গেছে, তিনি বিধি লঙ্ঘন করে দশম গ্রেড থেকে সরাসরি পঞ্চম গ্রেডের বেতন তুলছেন। অনুসন্ধানী টিমের মুখোমুখি হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে না পেরে দরজা বন্ধ করে দেন।

মুফতি মহিউদ্দিন কাসেম: ১১ বছর বয়সে এসএসসি পাশের ‘অলৌকিক’ দাবি!

সাবেক ধর্মমন্ত্রী শেখ আব্দুল্লাহর ভাগ্নে হওয়ার সুবাদে মুফতি মহিউদ্দিন কাসেম বায়তুল মোকাররমের পেশ ইমাম পদে নিয়োগ পান বলে অভিযোগ। তার নথিপত্র বিশ্লেষণ করে পাওয়া গেছে অবিশ্বাস্য সব তথ্য:

  • বয়স বিভ্রাট: তার দাখিল করা নথিতে জন্ম সাল ১৯৮৭ দেখানো হয়েছে, অথচ মাধ্যমিক পাশের সাল ১৯৯৮। অর্থাৎ মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি মাধ্যমিক পাশ করেছেন!

  • সনদ ও মার্কশিটে গরমিল: তার সার্টিফিকেটে মাদ্রাসার নাম ‘জামেয়া রহমানিয়া’ থাকলেও মার্কশিটে দেওয়া ‘বায়তুল উলুম ঢালকা নগর’। এমনকি রেজিস্ট্রেশন নম্বর এবং পাশের সালেও রয়েছে ব্যাপক অমিল।

  • পাসপোর্ট জালিয়াতি: পাসপোর্ট অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী তার প্রকৃত জন্ম সাল ১৯৮১, কিন্তু নিয়োগ পেতে তিনি বয়স ৬ বছর কমিয়ে ১৯৮৭ করেছেন।

  • নৈতিক স্খলন: তার বিরুদ্ধে নৈতিক অধঃপতনের মতো স্পর্শকাতর অভিযোগে মুচলেকা দেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।

আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ: আবেদন ছাড়াই খাদেম নিয়োগ!

চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের চিত্র আরও ভয়াবহ। সেখানে আতাউর রহমান নামের এক ব্যক্তি খাদেম পদে নিয়োগ পেয়েছেন, অথচ তিনি ওই পদের জন্য আবেদনই করেননি!

  • ভুয়া দাউরায়ে হাদিস সনদ: তিনি হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে দাউরায়ে হাদিস পাশের একটি সনদ জমা দিয়েছিলেন। স্টার নিউজ হাটহাজারী মাদ্রাসায় গিয়ে যাচাই করে দেখেছে যে, ওই নামে কোনো ছাত্র সেখানে ছিল না এবং সনদটি সম্পূর্ণ জাল। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি মারমুখী আচরণ করেন।

মাওলানা এহসানুল হক ও আনোয়ারুল হক: ক্ষমতার অপব্যবহার

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সাবেক মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজালের ভাগ্নে মাওলানা এহসানুল হক বর্তমানে আন্দরকিল্লা মসজিদের পেশ ইমাম। তার বিরুদ্ধে পাঁচটি গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে খোদ ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। অন্যদিকে, মাওলানা আনোয়ারুল হকের নিয়োগ নথিতে নয়জন সদস্যের কমিটির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সাতজনই স্বাক্ষর করেননি। জনপ্রশাসন, অর্থ ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ছাড়াই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নির্দেশে এই নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়।

যোগ্যদের বঞ্চনা ও নম্বরপত্র গায়েব

এই জালিয়াতির বলি হয়েছেন মাওলানা আব্দুল হাফিজ মারুফ এবং মুফতি ইলিয়াস হোসেনের মতো যোগ্য প্রার্থীরা।

  • নম্বর জালিয়াতি: মুফতি ইলিয়াস হোসেন লিখিত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেলেও মৌখিক পরীক্ষায় তাকে পরিকল্পিতভাবে ফেল করানো হয়। পরবর্তীতে উচ্চ আদালতের নির্দেশে নম্বরপত্র চাওয়া হলে ইসলামিক ফাউন্ডেশন জানায় যে, ওই নম্বরপত্রগুলো ‘গায়েব’ হয়ে গেছে।

  • বঞ্চিতদের আর্তনাদ: যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও বঞ্চনার শিকার হয়ে এই আলেমগণ এখন দ্বারে দ্বারে বিচার চেয়ে ঘুরছেন।

কর্তৃপক্ষের নীরবতা ও তদন্তের প্রহসন

গত ছয় বছরে পাঁচটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও মাত্র একটি কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। রহস্যজনক কারণে প্রভাবশালী মহলের চাপে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে বর্তমান ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক আশ্বাস দিয়েছেন যে, যারা ভুয়া সনদ দিয়ে চাকরি নিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


📋 জালিয়াতির এক নজরে চিত্র

🚩 ইমাম নিয়োগে প্রধান জালিয়াতিসমূহ

অভিযুক্তের নাম জালিয়াতির ধরণ
মাওলানা মিজানুর রহমান বয়স ৩ বছর কমানো, আত্মীয়ের মাধ্যমে নিয়োগ ও অবৈধ বেতন বৃদ্ধি।
মুফতি মহিউদ্দিন কাসেম বয়স ৬ বছর কমানো, ১১ বছর বয়সে এসএসসি পাশের সনদ ও পাসপোর্ট জালিয়াতি।
আতাউর রহমান (চট্টগ্রাম) আবেদন ছাড়াই নিয়োগ এবং হাটহাজারী মাদ্রাসার ভুয়া সনদ দাখিল।
মাওলানা এহসানুল হক শর্ত বহির্ভূত নিয়োগ ও অভিজ্ঞতার ভুয়া সনদ।

পবিত্র মসজিদের মিম্বর যেখানে সত্য ও ন্যায়ের কথা বলার জায়গা, সেখানে যদি অসত্য ও জালিয়াতির মাধ্যমে কেউ আসীন হন, তবে তা জাতির জন্য চরম অবমাননাকর। সাধারণ মানুষের দাবি, এই ‘জালিয়াতির ইমাম’দের দ্রুত অপসারণ করে যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে জাতীয় মসজিদের সম্মান পুনরুদ্ধার করা হোক।


এ জাতীয় আরো খবর...