ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে দেশ ছেড়েছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব। প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও তার আকস্মিক দেশত্যাগ এবং দায়িত্বে ফিরে না আসা নিয়ে কাটেনি ধোঁয়াশা। কাগজে-কলমে ‘ছুটি’র কথা বলা হলেও, দিন যত গড়াচ্ছে তার বিরুদ্ধে ওঠা ৫৫০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগগুলো ততই ডালপালা মেলছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আইনি জটিলতা ও শাস্তির ভয়েই তিনি সুকৌশলে ‘সেফ এক্সিট’ নিয়েছেন।
তয়বের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সিংহভাগই মোবাইল হ্যান্ডসেট খাত নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু ব্র্যান্ডকে সুবিধা দিতে তিনি ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR) বা অবৈধ ফোন বন্ধের প্রযুক্তিটি ব্যবহার করেছেন।
বর্তমানে দেশে শাওমি, স্যামসাং, ভিভো ও অপোর মতো ১৮টি বিদেশি প্রতিষ্ঠান এবং ওয়ালটন ও সিম্ফনির মতো দেশীয় প্রতিষ্ঠান ফোন অ্যাসেম্বল (সংযোজন) করছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, তয়ব আমদানিকৃত ফোনের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে এই অ্যাসেম্বলিং কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বড় অঙ্কের সুবিধা নিয়েছেন। অথচ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে যা হচ্ছে তা মূলত ‘স্ক্রু ড্রাইভার ইন্ডাস্ট্রি’; যেখানে বিদেশ থেকে পার্টস এনে শুধু জোড়া লাগানো হয়, প্রকৃত উৎপাদন নয়।
শুধু হ্যান্ডসেট নয়, তয়বের থাবা ছিল অবকাঠামো প্রকল্পেও:
বাজেট বৃদ্ধি: বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার প্রকল্পের বাজেট ১৫৫ কোটি থেকে লাফিয়ে ৩২৬ কোটিতে তোলা হয়। এই অতিরিক্ত ১৬১ কোটি টাকার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা মেলেনি।
টেন্ডার জালিয়াতি: ১০৬০ কোটি টাকার ফাইভ-জি রেডিনেস প্রকল্পে একটি নির্দিষ্ট চীনা কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডারের শর্ত বদলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি দুদকের তদন্ত চলাকালীন তিনি নিজেই তড়িঘড়ি করে প্রকল্পের কারিগরি সক্ষমতা সত্যায়িত করেছিলেন।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে গ্রামীণফোনকে ৭০০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ বরাদ্দ দেওয়া নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ১০০ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে তিনি এই একচেটিয়া সুবিধা পাইয়ে দেন। এছাড়া মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’-এর পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নিজের অনুগতদের বসানোর মাধ্যমে প্রায় ২৩০০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের পথ প্রশস্ত করার অভিযোগও তদন্তাধীন। এর মধ্যে ১৭০০ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে দেশ ছাড়ার পর প্রেস সচিব জানিয়েছিলেন তিনি ছুটিতে আছেন। কিন্তু পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তৈয়্যবের রহস্যময় স্ট্যাটাস এবং ‘মুখ খুললে অনেকের আন্ডারওয়্যার খসে পড়ার’ হুমকির পর বিষয়টি ভিন্ন মোড় নেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তদন্তের জাল চারদিকে ছড়িয়ে পড়ায় তিনি কৌশলে দেশ ছেড়েছেন।
বিবিসিকে দেওয়া এক বার্তায় তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে মাফিয়া চক্রের ষড়যন্ত্রের কথা বললেও, কেন তিনি এখনো কাজে যোগ দেননি—সেই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির নয়, বরং বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে হলে এই ধরনের হাই-প্রোফাইল দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি।