শিরোনামঃ
বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬, ১০:৪৬ পূর্বাহ্ন

ইরানের ‘ফাত্তাহ-২’ কি ইসরায়েলের অপরাজেয় প্রতিরক্ষা কবচ ভেঙে দিল?

বিশেষ বিশ্লেষণ | তেহরান-তেল আবিব / ৩ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০২৬

ইসরায়েলের অত্যাধুনিক রাডার স্ক্রিনে সংকেত ভেসে ওঠার আগেই কি ধেয়ে আসছে ধ্বংসযজ্ঞ? সময় মাত্র ৪ মিনিট ২০ সেকেন্ড। তেহরান থেকে নিক্ষেপ করার পর এইটুকুন সময়ের মধ্যেই ইরানের নতুন হাইপারসনিক মিসাইল ‘ফাত্তাহ-২’ পৌঁছে যাচ্ছে ইসরায়েলের হৃদপিণ্ডে। অথচ ইসরায়েলের পূর্ণাঙ্গ সতর্ক সংকেত বা সাইরেন সিস্টেম চালু হতে সময় লাগে পুরো ৬ মিনিট। অর্থাৎ, মানুষ সাইরেন শোনার অন্তত ১ মিনিট ৪০ সেকেন্ড আগেই আঘাত হানছে এই মরণাস্ত্র।

কেন এই একটি অস্ত্র পুরো মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সমীকরণ বদলে দিচ্ছে? আজকের বিশেষ প্রতিবেদনে থাকছে তার ব্যবচ্ছেদ।

ফাত্তাহ-২: কেন এটি এত ভয়ঙ্কর?

ইরানের এই নতুন অস্ত্রটি কেবল একটি মিসাইল নয়, এটি একটি হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল (HGV)। এর সক্ষমতা আধুনিক সমরবিজ্ঞানীদেরও চমকে দিয়েছে:

  • অবিশ্বাস্য গতি: এটি ‘ম্যাক-১৫’ গতিতে ছুটতে সক্ষম, যা ঘণ্টায় প্রায় ১১,৫০০ মাইল। অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে এটি ৩ মাইলেরও বেশি পথ পাড়ি দেয়।

  • দূরত্ব ও সময়: তেহরান থেকে তেল আবিবের দূরত্ব প্রায় ৯৯০ মাইল। ফাত্তাহ-২ এই পথ পাড়ি দিচ্ছে মাত্র ৪ মিনিট ২০ সেকেন্ডে।

  • ধূর্ত কৌশল: প্রচলিত ব্যালিস্টিক মিসাইল ধনুকের মতো বাঁকা পথে চলে, যা রাডার সহজেই শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু ফাত্তাহ-২ বায়ুমণ্ডলের ভেতরেই সার্ফিং বোর্ডের মতো গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। ফলে কোনো রাডার এর সঠিক গন্তব্য আগে থেকে আঁচ করতে পারে না।

অকেজো হয়ে পড়ছে কি আয়রন ডোম ও অ্যারো সিস্টেম?

গত ১৫ বছর ধরে ইসরায়েলকে সুরক্ষা দেওয়া বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। বিজ্ঞান বলছে, ফাত্তাহ-২ এর সামনে এগুলো প্রায় অসহায়:

১. অ্যারো-৩ (Arrow-3): এটি ১০০ কিমি উচ্চতার বাইরের টার্গেট ধ্বংস করতে তৈরি। কিন্তু ফাত্তাহ-২ চলে ৫০ কিমি-র নিচ দিয়ে, যা অ্যারো-৩ এর রেঞ্জের বাইরে। ২. ডেভিডস স্লিং (David’s Sling): এটি ম্যাক ৫ থেকে ৮ গতির মিসাইল ঠেকাতে পারে। কিন্তু ফাত্তাহ-২ এর গতি তার প্রায় দ্বিগুণ (ম্যাক-১৫)। ৩. আয়রন ডোম (Iron Dome): এটি মূলত স্বল্প পাল্লার রকেট ঠেকানোর জন্য। হাইপারসনিক মিসাইলের প্রচণ্ড গতির সামনে এটি পুরোপুরি অকার্যকর।

সাইরেন বাজার আগেই বিস্ফোরণ!

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয়টি হলো ইসরায়েলের ‘হোম ফ্রন্ট কমান্ড’-এর সময় কাঠামো। একটি রকেট শনাক্ত করে সাধারণ মানুষকে শেল্টারে পাঠানো পর্যন্ত তাদের দরকার প্রায় ৬ মিনিট। কিন্তু মিসাইল এসে পড়ছে ৪ মিনিট ২০ সেকেন্ডে।

তেল আবিবের একজন নাগরিকের নিরাপদ শেল্টারে পৌঁছাতে অন্তত ৯০ সেকেন্ড সময় লাগে। কিন্তু ফাত্তাহ-২ এর ক্ষেত্রে তারা সময় পাচ্ছে মাত্র ২০ সেকেন্ডের মতো। এর মানে হলো, মানুষ শেল্টারের দিকে দৌড়ানো শুরু করার আগেই সব শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

নতুন যুগের যুদ্ধ ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ

এই ৪ মিনিট ২০ সেকেন্ডের যুদ্ধ আসলে কেবল সামরিক শক্তির লড়াই নয়, এটি একটি প্রচণ্ড মনস্তাত্ত্বিক চাপ। গত দেড় দশক ধরে ইসরায়েলি নাগরিকরা যে ‘নিরাপত্তার বোধ’ নিয়ে বাস করত, তা এখন বড় প্রশ্নের মুখে। সতর্ক সংকেত ছাড়াই যখন আকাশ থেকে আগুনের গোলা নেমে আসবে, তখন সাধারণ মানুষের মাঝে তৈরি হবে চরম আতঙ্ক।

ইরানের এই প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। ফাত্তাহ-২ প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, প্রথাগত ডিফেন্স সিস্টেম এখন অতীত। এই নতুন বাস্তবতা ইসরায়েলকে তাদের প্রতিরক্ষা কৌশলে আমূল পরিবর্তন আনতে বাধ্য করবে, যা সম্পন্ন করতে হয়তো আরও বহু বছর সময় লাগবে।

যখন সময় জীবনের চেয়েও দ্রুত দৌড়ায়, তখন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও অনেক সময় নিরুপায় হয়ে পড়ে। ফাত্তাহ-২ কি তবে আগামীর যুদ্ধের নতুন সংজ্ঞা লিখে দিল?


এ জাতীয় আরো খবর...