ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র ‘খার্গ দ্বীপ’ (Kharg Island) দখলের যে পরিকল্পনা নিয়ে বর্তমানে পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসে তোড়জোড় চলছে, তার প্রেক্ষাপট একদিনের নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই রণকৌশলের শেকড় মূলত চার দশক গভীরে প্রোথিত। ১৯৮০-র দশকে যখন তিনি একজন উঠতি ব্যবসায়ী ছিলেন, তখনই তিনি প্রথমবার এই দ্বীপটি কবজা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৮৮ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প অত্যন্ত কড়া ভাষায় ইরানের প্রতি তাঁর কঠোর মনোভাব ব্যক্ত করেছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, “ইরান দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করছে এবং বিশ্বমঞ্চে আমেরিকাকে বোকা বানাচ্ছে।” সেই সময়েই তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, মার্কিন কোনো জাহাজ বা সেনার ওপর একটি গুলি চললে তিনি খার্গ দ্বীপ দখল করে ইরানকে উচিত শিক্ষা দেবেন। মূলত ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব এবং তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকটের পর থেকেই ইরানের প্রতি তাঁর এই অনড় অবস্থানের জন্ম।
বর্তমানে ইরানের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো এই খার্গ দ্বীপ। কারণ:
রপ্তানি কেন্দ্র: ইরান তাদের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে রপ্তানি করে থাকে।
অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড: এই স্থাপনাটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার মানে হলো ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি পঙ্গু করে দেওয়া। সংবাদমাধ্যম এক্সিওস দাবি করেছে, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে এই দ্বীপটি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের গোপন বৈঠক হয়েছে, যেখানে ট্রাম্পের পুরনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক তৎপরতার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ১৯৭০-এর দশকের আরব তেল নিষেধাজ্ঞার পর চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হলেও বর্তমানে এই পথটি চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ব্লুমবার্গের রিপোর্ট অনুযায়ী, হামলার এক সপ্তাহ পরেও ইরান কোনোমতে খার্গ দ্বীপ থেকে তেল লোড করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল, তবে বর্তমান সামরিক পরিস্থিতির কারণে এই স্থাপনাটি কতটা কার্যকর আছে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি অনেকটা ‘ব্যবসায়িক ডিল’ ও ‘জাতীয় মর্যাদার’ সংমিশ্রণ। আশির দশকে যখন ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলছিল, তখনও ট্রাম্প প্রশ্ন তুলেছিলেন যে ইরাকের সঙ্গে পেরে না ওঠা ইরান কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে চোখ রাঙায়। আজ ৪০ বছর পর প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি তাঁর সেই পুরনো অবস্থানেই অনড় রয়েছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।