২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের মহদিলিল ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ এখন মহাসংকটের মুখে। আজ (১২ মার্চ) বসতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। কিন্তু সংসদের ভেতরে ও বাইরে এখন কেবলই শঙ্কা আর অবিশ্বাসের সুর। বিশেষ করে এনসিপি নেতা ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলামের সাম্প্রতিক বক্তব্যে নতুন করে আন্দোলনের রণধ্বনি শোনা যাচ্ছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, “আমাদের আরেকটি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে হবে। এবার আমরা ভুল করতে চাই না।” এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নাহিদ ইসলাম দেশ আবারও ‘একদলীয় স্বৈরতন্ত্রের’ দিকে ধাবিত হচ্ছে কি না, সেই গুরুতর প্রশ্নও তুলেছেন।
রাজনীতি যখন উত্তপ্ত, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে হাজির হয়েছে আদালত। সুপ্রিম কোর্টের দুজন আইনজীবী জুলাই সনদ এবং গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করায় পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে। হাইকোর্ট চার সপ্তাহের রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, কেন এই সনদ ও অধ্যাদেশকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না?
এই আইনি পদক্ষেপকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের মতে, সরকারি দল আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে জুলাই সনদকে নস্যাৎ করতে চাইছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অতীত সরকারের পথে হাঁটলে এর দায়ভার বিএনপিকেই নিতে হবে।
নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি ক্ষমতায় গেলেও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে তাদের অবস্থান বেশ ‘টেকনিক্যাল’। বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ বলছেন, যেহেতু বিষয়টি এখন আদালতের অধীনে, তাই সংসদকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সময় আদালতের নির্দেশনা মাথায় রাখতে হবে। এমনকি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ নিতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে বিএনপি। তাদের যুক্তি, বিদ্যমান সংবিধানে এমন কোনো পরিষদের অস্তিত্ব নেই।
অন্যদিকে, এনসিপি মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, বিএনপি ‘ডুয়াল গেম’ খেলছে এবং জনগণের রায়কে অবমাননা করছে। উল্লেখ্য, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রায় ৯৭ শতাংশ মানুষ এই সনদের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিলেন।
সংসদে ডেপুটি স্পিকারের পদ নিয়ে সাপ-লুডু খেলা শুরু হয়েছে। বিএনপি চাইছে বিরোধী দলকে এই পদ দিয়ে একটি ঐকমত্যের বার্তা দিতে। কিন্তু জামায়াত ও এনসিপির শর্ত পরিষ্কার— আগে জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের (যেমন: দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ও পিআর পদ্ধতি) সুস্পষ্ট রূপরেখা দিতে হবে। রূপরেখা ছাড়া পদ গ্রহণ করা তাদের কাছে নৈতিকভাবে অর্থহীন।
আজকের সংসদ অধিবেশনে জুলাই সনদ নিয়ে তীব্র বিতর্কের সম্ভাবনা রয়েছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় তিনটি শঙ্কা দেখা দিচ্ছে:
আইনি সংকট: চার সপ্তাহ পর হাইকোর্ট যদি সনদের বিপক্ষে রায় দেয়, তবে সংসদের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে।
রাজপথের সংঘাত: সংসদীয় প্রক্রিয়ায় ব্যর্থ হলে জামায়াত ও এনসিপি রাজপথে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তুলতে পারে।
ঐক্যের ভাঙন: অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার রাজনৈতিক ঐক্য এখন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার মুখে, যা দেশের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।
৫ই আগস্টের অর্জন শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের মাইলফলক হবে নাকি আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক সপ্তাহের আদালত ও সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর। বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক চূড়ান্ত বাঁক বদলের অপেক্ষায়।