২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের মূল ভিত্তি ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নিয়ে রাজপথের পর এবার শুরু হয়েছে আইনি লড়াই। জুলাই সনদ এবং গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট দায়েরের পর নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। এই আইনি প্রক্রিয়াকে ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে রাজপথে নতুন আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি।
রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা হিসেবে যে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ সর্বমহলে আলোচিত হয়েছিল, সেটিই এখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজনরেখা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের দুজন আইনজীবী জুলাই সনদ এবং গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট আবেদন করেন। এর প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট চার সপ্তাহের সময় দিয়ে রুল জারি করেছেন— কেন এই অধ্যাদেশ ও সনদকে অবৈধ এবং অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না? আদালতের এই আকস্মিক হস্তক্ষেপকে ভালো চোখে দেখছে না গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, অতীতে অনেক সরকারই নিজেদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন বা দায় এড়াতে আদালতকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। একই অভিযোগ তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি সরাসরি অভিযোগ করে বলেন, “আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে জুলাই সনদ ও গণভোটকে অবৈধ ঘোষণার চেষ্টা করছে সরকারি দল। এটি একটি বিপজ্জনক খেলা।” তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বর্তমান সরকার বা কোনো বড় রাজনৈতিক দল যদি অতীত সরকারের মতো একই পথে হাঁটতে চায়, তবে তার চরম মূল্য দিতে হবে। বিশেষ করে এই প্রক্রিয়ার পেছনে বিএনপির কোনো প্রচ্ছন্ন সমর্থন থাকলে সেই দায়ভারও তাদের নিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ভেতরের খবর অনুযায়ী, জুলাই সনদ রক্ষার প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি (ন্যাশনালিস্ট কনভেনশন পার্টি) একাট্টা হচ্ছে। দল দুটির শীর্ষ নেতারা মনে করছেন, জুলাই সনদ বাতিল হলে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা এবং ত্যাগের অবমাননা হবে। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে যেকোনো সময় বড় ধরনের রাজপথের আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারে এই নতুন জোট।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের মনে রাষ্ট্র সংস্কারের যে পাহাড়সম প্রত্যাশা ছিল, আইনি মারপ্যাঁচে তা ঢাকা পড়ে যাচ্ছে কি না— সেই প্রশ্ন এখন জনমনে। বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই সনদ কেবল একটি দলিল নয়, এটি ছিল হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। আদালত এবং রাজনীতির এই দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি না সাধারণ মানুষের সংস্কারের স্বপ্ন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।