সৌদী আরবের বাদশাহর পক্ষ থেকে পাঠানো উপহারের খেজুর কেন সাধারণ মানুষ পায় না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে এক ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, বন্ধুপ্রতিম দেশের পাঠানো এই ত্রাণ বা উপহার সরাসরি সাধারণ মানুষের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণের কথা। কিন্তু বাংলাদেশে এটি এখন আমলা ও প্রভাবশালীদের ‘ভিআইপি উপঢৌকন’ এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের ‘আয়ের উৎস’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, খেজুরের জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ভেড়ার পর থেকেই শুরু হয় ভাগ-বাটোয়ারা। প্রথম দফায় একটি বড় অংশ সচিবালয় ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের কর্মকর্তাদের আপ্যায়ন এবং তাদের পারিবারিক চাহিদার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। দ্বিতীয় দফায়, জেলা পর্যায়ে পাঠানোর সময় পরিবহন খরচ বাঁচানোর দোহাই দিয়ে অনেক সময় গুদামের অসাধু কর্মকর্তারা রাতের আঁধারে খেজুরের বস্তা বদলে সাধারণ নিচু মানের খেজুর ঢুকিয়ে দেয়। উন্নত মানের ‘আজওয়া’ বা ‘সুফারি’র মতো খেজুরগুলো চলে যায় রাজধানীর বাদামতলী বা কারওয়ান বাজারের বড় বড় আড়তে। সেখানে সৌদীর সিল মুছে দেশীয় সাধারণ প্যাকেটে এগুলো কয়েক গুণ দামে বিক্রি হয়।
| সাল | খেজুরের পরিমাণ (টন) | অনুমানিত গন্তব্য/অবস্থা |
|---|---|---|
| ২০২২ | ১,৫০০ টন | ৪০% নষ্ট হওয়া ও ইঁদুরে খাওয়ার অজুহাতে গায়েব। বাকিটা কালোবাজারে। |
| ২০২৩ | ২,০০০ টন | প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কোটায় ৭০% বণ্টন। |
| ২০২৪ | ৪০০ টন | সংঘাতময় পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে বিতরণে ধীরগতি। আড়তে বিক্রির প্রমাণ। |
| ২০২৫ | ১৫৪ টন | সরকারি গুদামে মেয়াদের অধিকাংশ সময় পড়ে থাকায় মান হারানো। |
| ২০২৬ (চলতি) | ৩০০ টন | সদ্য আগত। এখনও মাঠ পর্যায়ে বিতরণের কোনো স্বচ্ছ তথ্য নেই। |
*তথ্যসূত্র: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধান*
২০২৬ সালে রমজানকে সামনে রেখে সৌদী সরকার ইতিমধ্যে প্রায় ৩০০ টন খেজুরের চালান পাঠিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রতিটি জেলার ত্রাণ শাখায় এই খেজুর পৌঁছানোর কথা। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এখনও জানেনই না তাদের নামে কতটুকু খেজুর বরাদ্দ হয়েছে।
প্রতি বছর রমজান আসার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষ এই খেজুর নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু প্রতিটি স্তরে এমন একটি শক্তিশালী জাল বোনা হয়েছে যে, সাধারণ ত্রাণ কার্ডধারীদের কাছে যখন এই খেজুর পৌঁছানোর সময় হয়, তখন জানানো হয় ‘বরাদ্দ কম’ বা ‘আসেনি’।
বাস্তবতা হলো, জেলা প্রশাসন থেকে উপজেলা পর্যায়ে যাওয়ার পর অধিকাংশ খেজুর আর ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত পৌঁছায় না। অনেক সময় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার-চেয়ারম্যানরা এই খেজুর দিয়ে নিজেদের আত্মীয়-স্বজনদের আপ্যায়ন করেন।
এই ‘খেজুর ক্রাইম’ রুখতে হলে প্রতিটি চালানের সাথে একটি ডিজিটাল কিউআর কোড যুক্ত করা জরুরি, যা দিয়ে সাধারণ মানুষ দেখতে পারবে কোন চালানের কতটুকু খেজুর কোন এলাকায় পৌঁছাল। সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বিতরণ করা হলে এই পুকুরচুরি রোধ করা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।