বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী ও নজিরবিহীন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আজ বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। সাধারণত বিদায়ী স্পিকারের সভাপতিত্বে নতুন সংসদের যাত্রা শুরু হওয়ার সাংবিধানিক রীতি থাকলেও, এবার স্পিকারের ‘শূন্য চেয়ার’ রেখেই শুরু হচ্ছে কার্যক্রম।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তৎকালীন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেন। অন্যদিকে, ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু বর্তমানে কারাগারে বন্দি। ফলে দীর্ঘ সময় পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর আজকের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার মতো কোনো স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার সংসদীয় কাঠামোতে নেই।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, আজ অধিবেশনের শুরুতেই সবার নজর থাকবে সংসদ নেতা তারেক রহমানের দিকে। সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সংসদ নেতার স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে অধিবেশন শুরু হবে।
আজকের সূচি এক নজরে:
অস্থায়ী সভাপতি নির্বাচন: সংসদ নেতা তারেক রহমান সভার শুরুতে একজন সিনিয়র সংসদ সদস্যের নাম প্রস্তাব করবেন সভাপতিত্ব করার জন্য। অন্য একজন সদস্য তা সমর্থন করবেন। সেই অস্থায়ী সভাপতির অধীনেই শুরু হবে মূল কার্যক্রম।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন: অস্থায়ী সভাপতির পরিচালনায় সংসদ সদস্যরা কণ্ঠভোটের মাধ্যমে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করবেন। যদি একাধিক প্রার্থী না থাকে, তবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তারা নির্বাচিত হবেন।
শপথ গ্রহণ: নির্বাচিত হওয়ার পর অধিবেশন কিছুক্ষণের জন্য মুলতবি হবে। এই সময়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংসদ ভবনেই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথবাক্য পাঠ করাবেন।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ: নতুন স্পিকারের সভাপতিত্বে পুনরায় অধিবেশন শুরু হলে রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দেবেন। এছাড়া শোক প্রস্তাব ও জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনার জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে।
জুলাই জাতীয় সনদে বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার করার প্রস্তাব থাকলেও, জামায়াতে ইসলামী সেই পদ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার স্পষ্ট করেছেন, জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও আইনি নিষ্পত্তির আগে তারা এই পদ নিতে চান না। অন্যদিকে, বিএনপি নিজেদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার রক্ষায় এই পদটি বিরোধী দলকে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে।
অধিবেশন শুরুর আগের দিন গতকাল বুধবার সংসদ ভবনে বিএনপির সংসদীয় দলের সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংসদ নেতা তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় দলের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় তারেক রহমান নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে নির্দেশনামূলক বক্তব্যে বলেছেন, “জুলাই সনদের যেসব বিষয় বাস্তবায়নযোগ্য, সরকার সেগুলো বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ উদ্যোগ নেবে।”
সংসদ গবেষকদের মতে, এবারের সংসদটি অত্যন্ত ‘ব্যতিক্রমী’। কারণ, সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতাসহ নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের প্রায় ৭৬ শতাংশই এবার নতুন মুখ। ৫ই আগস্টের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর গঠিত এই সংসদ রাষ্ট্র সংস্কারের কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে যাত্রা শুরু করছে।