শিরোনামঃ
বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬, ১০:৫২ পূর্বাহ্ন

ইরানি নারী ফুটবলারদের মানবিক ভিসা ও ট্রাম্পের বার্তা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক / ৩ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০২৬

এএফসি ওমেন্স এশিয়ান কাপ খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে নিখোঁজ হওয়া এবং পরবর্তীতে মানবিক ভিসা পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এখন ইরানের নারী ফুটবল দল। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপ, অন্যদিকে ইরানের ‘দেশদ্রোহী’ তকমা ও ফিরে আসার আকুতি—সব মিলিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন এই নারী অ্যাথলেটরা।

ঘটনার সূত্রপাত: জাতীয় সঙ্গীতে নীরবতা

ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার নিহত হওয়ার খবরের মাঝেই এশিয়ান কাপে খেলতে নামে ইরান। প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে জাতীয় সঙ্গীত বাজার সময় ইরানি ফুটবলাররা নিশ্চুপ থাকেন। এই নীরব প্রতিবাদ মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ইরানে সরকারি মদদপুষ্ট সংবাদমাধ্যমে তাদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

পরবর্তী ম্যাচগুলোতে তারা জাতীয় সঙ্গীতে কণ্ঠ দিলেও বিশ্লেষকদের মতে, সেটি ছিল প্রচণ্ড সরকারি চাপের ফল। এই চাপের মুখে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।

অস্ট্রেলিয়ার মানবিক ভিসা ও ট্রাম্পের ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ পোস্ট

সোমবার রাতে দলীয় হোটেল ছেড়ে গোপনে বেরিয়ে অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষের কাছে আশ্রয় চান অধিনায়ক জহরা ঘানবারিসহ পাঁচজন খেলোয়াড়। এই খবরটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নজরে এলে তিনি তার প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ সরাসরি পোস্ট দেন। ট্রাম্প লেখেন:

“অস্ট্রেলিয়া যদি এই নারীদের আশ্রয় না দেয়, তবে আমেরিকা দেবে।”

এর কিছুক্ষণ পর তিনি আরও জানান যে, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের সঙ্গে তার কথা হয়েছে এবং খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অথচ ট্রাম্প প্রশাসনের শরণার্থী নীতি নিয়ে আগে থেকেই বিতর্ক ছিল, যা এই পদক্ষেপে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

সাতজনকে ভিসা ও একজনের প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত

অস্ট্রেলিয়ার ইমিগ্রেশন মন্ত্রী টনি বার্ক বুধবার নিশ্চিত করেছেন যে, মোট সাতজন ইরানি ফুটবলারকে মানবিক ভিসা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে তারা অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে থাকা, কাজ ও পড়াশোনার সুযোগ পাবেন। তবে নাটকীয়ভাবে শেষ দুইজন ভিসা প্রাপকের মধ্যে একজন পুনরায় ইরানে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। সতীর্থদের সঙ্গে আলোচনার পর তিনি তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন, যাকে অস্ট্রেলিয়া সরকার ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতা’ হিসেবে সম্মান জানিয়েছে।

সমর্থকদের আকুতি: ‘সেভ আওয়ার গার্লস’

ফিলিপাইনের বিপক্ষে ম্যাচের পর স্টেডিয়ামের বাইরে কয়েক হাজার প্রবাসী ইরানি সমর্থক সমবেত হন। ড্রামের তালে তালে তারা স্লোগান দেন— “সেভ আওয়ার গার্লস” (আমাদের মেয়েদের বাঁচাও)। খেলোয়াড়দের বাসের চারপাশে মানবপ্রাচীর তৈরি করে তারা দাবি তোলেন যেন তাদের ইরানে ফেরত পাঠানো না হয়। হ্যারি পটার সিরিজের লেখিকা জে কে রাউলিং এবং ইরানের নির্বাসিত শাহজাদা রেজা পাহলভিও এই ফুটবলারদের পক্ষে সংহতি জানান।

ইরানের ‘বিপরীত’ অবস্থান ও বিশ্বকাপ বর্জন

খেলোয়াড়দের দলছুট হওয়ার পর ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন তাদের কঠোর সমালোচনা করলেও পরবর্তীতে সুর নরম করে প্রসিকিউটর জেনারেলের দপ্তর। এক বিবৃতিতে খেলোয়াড়দের ‘স্বস্তি ও আস্থার সঙ্গে’ মাতৃভূমিতে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়। এমনকি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক বার্তায় বলেন, “চিন্তা কোরো না, ইরান তোমাদের স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছে।”

তবে এই উদারতার ঠিক উল্টো পিঠ দেখা গেছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে। যদিও ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনো জানিয়েছেন ট্রাম্প প্রশাসন ইরান দলকে স্বাগত জানাবে, কিন্তু ইরান বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে তারা যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপে অংশ নেবে না। ইরানের ক্রীড়ামন্ত্রী আহমদ দোনইয়ামালি বলেন:

“যেহেতু এই সরকার আমাদের নেতাকে হত্যা করেছে, তাই সেখানে আমাদের ছেলেরা নিরাপদ নয়। অংশগ্রহণের মতো উপযুক্ত পরিবেশ সেখানে নেই।”

ইরানি নারী ফুটবলারদের এই ঘটনা কেবল একটি ক্রীড়া সংবাদ নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মানবাধিকার এবং নারীর স্বাধীনতার সংগ্রামের এক প্রতিফলন। মাঠের লড়াই শেষ হলেও এই সাতজন ফুটবলারের জীবনের লড়াই এখন এক নতুন বাঁক নিয়েছে।


এ জাতীয় আরো খবর...