দীর্ঘ চার দশক ধরে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যে ‘ইরান-ভীতি’র রাজনীতি করেছেন এবং যে স্বপ্ন নিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের দামামা বাজিয়েছিলেন, তা এখন বুমেরাং হতে শুরু করেছে। মিডল ইস্ট মনিটরের এক সাম্প্রতিক নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর অতি আত্মবিশ্বাস এবং একক শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার এখন তাকে এক রাজনৈতিক ও সামরিক পতনের কিনারে নিয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিবন্ধ অনুযায়ী, নেতানিয়াহু ভেবেছিলেন এটি হবে একটি ‘দ্রুত ও নিখুঁত’ বিজয়। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে দেখা যাচ্ছে, ইরান তার সামরিক সম্পদ এবং প্রক্সি নেটওয়ার্ক (লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন) এমনভাবে ছড়িয়ে রেখেছে যে ইসরায়েলের আকাশপথে শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও তারা দ্রুত বিজয়ের স্বাদ পাচ্ছে না। বরং এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ইসরায়েলি রিজার্ভ সৈন্যদের ক্লান্ত করছে এবং দেশের জাতীয় মনোবল ধসিয়ে দিচ্ছে।
নেতানিয়াহুর জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে হোয়াইট হাউসের পরিবর্তনশীল অবস্থান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মাগা’ (MAGA) রাজনীতি মূলত স্বার্থকেন্দ্রিক। ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের অন্তহীন যুদ্ধের বোঝা বইতে নারাজ; বরং তিনি ইরানের সাথে একটি ‘লাভজনক চুক্তিতে’ পৌঁছাতে বেশি আগ্রহী। নেতানিয়াহুর আদর্শিক লড়াইয়ের সাথে ট্রাম্পের এই বাস্তববাদী ব্যবসায়িক চিন্তার দূরত্ব ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একা করে দিচ্ছে।
যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯২ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালীতে অস্থিতিশীলতার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এখন অনিশ্চিত। এই মুদ্রাস্ফীতি আমেরিকা ও ইউরোপের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা ট্রাম্পের মতো নেতার জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে ট্রাম্প যেকোনো সময় এককভাবে ‘বিজয় ঘোষণা’ করে এই সংঘাত থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন, যার পুরো দায়ভার তখন একা নেতানিয়াহুকেই বইতে হবে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ জনমত জরিপগুলো বলছে, সাধারণ মানুষ আর এই অন্তহীন যুদ্ধের ধকল নিতে পারছে না। নেতানিয়াহু গত কয়েক দশক ধরে ইরানকে যেভাবে ‘অস্তিত্বের হুমকি’ হিসেবে চিত্রিত করে ক্ষমতায় টিকে ছিলেন, এখন যুদ্ধের বাস্তব দুর্ভোগ সেই রাজনৈতিক ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। ব্যক্তিগত আইনি জটিলতা থেকে বাঁচতে এবং ক্ষমতা সুসংহত করতে যে যুদ্ধের জুয়া তিনি খেলেছিলেন, সেটিই এখন তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শেষ পেরেক হতে যাচ্ছে।
মিডল ইস্ট মনিটরের ভাষায়, নেতানিয়াহুর আজীবনের সাধনা এখন তার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতায় রূপ নেওয়ার পথে। যে রণহুঙ্কার দিয়ে তিনি যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, অদূর ভবিষ্যতে হয়তো তাকেই একটি অসম্মানজনক যুদ্ধবিরতির জন্য আকুতি জানাতে দেখা যাবে। ইতিহাসের পাতায় প্রজ্ঞার বদলে ব্যক্তিগত অহংকারকে প্রাধান্য দেওয়া নেতাদের স্থান খুব একটা সুখকর হয় না।
| সামরিক ব্যর্থতা | ইরানের ড্রোন ও প্রক্সি নেটওয়ার্কের কাছে ‘দ্রুত বিজয়’ থমকে যাওয়া। |
| কূটনৈতিক ফাটল | ট্রাম্পের ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি বনাম নেতানিয়াহুর আদর্শিক লড়াই। |
| অর্থনৈতিক ধস | তেলের দাম বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির কারণে মিত্রদের চাপ। |
| আস্থার সংকট | ইসরায়েলি জনগণের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ক্লান্তি ও ক্ষোভ। |