বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩৫ পূর্বাহ্ন

নিখোঁজ জেল পালানো ৭০ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪৩ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী অধ্যায় হলেও, এই পটপরিবর্তনের ডামাডোলে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় তৈরি হয়েছে এক গভীর ক্ষত। সরকার পতনের আগে ও পরে সারা দেশের বিভিন্ন কারাগারে যে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে, তার সুযোগ নিয়ে পালিয়ে যায় হাজার হাজার বন্দি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লাগাতার চেষ্টায় পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের একটি বড় অংশকে পুনরায় কারাগারে ফেরানো সম্ভব হলেও, এখনো জেলের বাইরে রয়ে গেছে ৭১৩ জন কয়েদি। এর চেয়েও ভয়ংকর তথ্য হলো, এই পলাতকদের তালিকায় রয়েছে ৭০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুর্ধর্ষ জঙ্গি। গত কয়েক মাস ধরে প্রশাসনের সমস্ত নজরদারি ও গোয়েন্দা জাল এড়িয়ে তারা আত্মগোপনে রয়েছে। লুণ্ঠিত অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র এবং এই নিখোঁজ জঙ্গিদের মেলবন্ধন বর্তমানে দেশের জন্য একটি ‘জ্যান্ত টাইমবোম’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গণ-অভ্যুত্থান ও কারাগারগুলোর অরক্ষিত রূপ

কারা অধিদপ্তরের তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশদভাবে বিশ্লেষণ করলে আগস্ট মাসের সেই দিনগুলোর এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। সরকার পতনের উত্তাল সময়ে দেশের অন্তত ১৭টি কারাগারে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল যে, নরসিংদী, শেরপুর ও সাতক্ষীরা কারাগার পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হয় এবং এই তিন কারাগারের সমস্ত বন্দি পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। সাধারণ কারাগার তো বটেই, দেশের সবচেয়ে সুরক্ষিত বলে বিবেচিত ‘কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি সেল’-এর মতো নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার দুর্গও সে সময় অরক্ষিত হয়ে পড়ে।

সরকারি হিসাবমতে, এই অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে মোট ২ হাজার ২৩২ জন বন্দি পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান এবং সাধারণ ক্ষমার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১ হাজার ৫১৯ জন কয়েদি স্বেচ্ছায় ফিরে আসে বা গ্রেপ্তার হয়। কিন্তু এখনো ৭১৩ জনের কোনো হদিস মেলেনি, যাদের মধ্যে অনেকেই দাগী অপরাধী এবং তালিকাভুক্ত জঙ্গি।

কাশিমপুর থেকে সাতক্ষীরা: পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা

কারাগারভিত্তিক পলাতক বন্দিদের পরিসংখ্যান দেশের নিরাপত্তার জন্য কতটা হুমকিস্বরূপ, তা সংশ্লিষ্ট জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়।

  • কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার: এই কারাগারের জেলার মো. জাকির হোসেন জানান, ৬ আগস্ট এখান থেকে জঙ্গিসহ মোট ২০২ জন দুর্ধর্ষ আসামি পালিয়ে যায়। এর মধ্যে অন্তত ৮৮ জন ছিল মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। পালানোর সময় কারারক্ষীদের সঙ্গে সংঘর্ষে ও গুলিতে ৬ জন মারা যায়। পালিয়ে যাওয়াদের মধ্যে বিভিন্ন বাহিনীর সহায়তায় এখন পর্যন্ত ৭২ জনকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও বাকিরা এখনো অধরা।

  • নরসিংদী জেলা কারাগার: ১৯ জুলাইয়ের ঘটনা স্মরণ করে জেল সুপার মো. তারেক কামাল জানান, ওই দিন ১০ থেকে ১২ হাজার উত্তেজিত জনতা কারাগারের মূল ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। এরপর নিষিদ্ধ সংগঠনের ৯ জন জঙ্গিসহ কারাগারের সেলে থাকা ৮২৬ জন কয়েদির সবাই পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে ৬৪৬ জন আত্মসমর্পণ করলেও এবং ৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও, ৯ জঙ্গিসহ ১৪৫ জন এখনো পলাতক রয়েছে।

  • সাতক্ষীরা ও কুষ্টিয়া কারাগার: ৫ আগস্ট সাতক্ষীরা কারাগারের প্রধান ফটকের তালা ভেঙে অন্তত ৫৯৬ জন কয়েদি ও হাজতি পালিয়ে যায়। তৎকালীন জেলার হাসনা জাহান বীথি জানান, পরবর্তী সময়ে অনেক কয়েদি আত্মসমর্পণ করেছে এবং ৪১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিসহ এখনো ৪৬ জন পলাতক। অন্যদিকে কুষ্টিয়া কারাগার থেকে পালানো ১০৫ জনের মধ্যে ৮৯ জন ফিরে এলেও ১৬-১৭ জনের খোঁজ নেই।

লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ: একটি জীবন্ত টাইমবোম

কেবল বন্দি পালানোই নয়, কারাগারগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুটের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেই সময় বিভিন্ন কারাগারের অস্ত্রাগার থেকে মোট ৬৭টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট করা হয়। এর মধ্যে নরসিংদী কারাগার থেকেই লুট হয়েছিল ৮৫টি অস্ত্র ও ৮ হাজার ১৫০টি গুলি (উভয় তথ্যের মাঝে পরিসংখ্যানগত তারতম্য থাকলেও লুটের পরিমাণ যে বিশাল, তা স্পষ্ট)। লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৭টি অত্যাধুনিক অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, এই উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রগুলো আত্মগোপনে থাকা জঙ্গিদের হাতে চলে যেতে পারে, যা দিয়ে তারা যেকোনো সময় বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে।

জঙ্গিদের নতুন কৌশল: এক ছাতার নিচে উগ্রবাদ

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নিবিড় পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে এক নতুন এবং উদ্বেগজনক সমীকরণ। এতদিন ধরে আরসা (ARSA), জেএমবি (JMB), হুজি-বি (HuJI-B), হিজবুত তাহ্‌রীর, জামা’আতুল মুজাহিদীন বা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এটিবি) মতো নিষিদ্ধ সংগঠনগুলো নিজেদের আদর্শিক ভিন্নতার কারণে আলাদা আলাদাভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করত। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই নিখোঁজ জঙ্গিরা এখন আর আলাদা নয়, বরং নিজেদের পুরনো পরিচয় গোপন করে একজোট হওয়ার চেষ্টা করছে।

তারা আত্মগোপনে থেকে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড বা ত্রাণ বিতরণের আড়ালে নতুন সদস্য সংগ্রহ করছে। এমনকি মার্শাল-আর্ট বা শারীরিক কসরত প্রশিক্ষণের নাম করে তরুণদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অত্যন্ত সুকৌশলে উগ্রবাদী তালিম দেওয়া হচ্ছে। আরও মারাত্মক অভিযোগ হলো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের সঙ্গে আঁতাত করে তারা দেশে নতুন করে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। এই আশঙ্কায় ইতোমধ্যেই দেশের ৮টি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা বা রেড অ্যালার্ট জারি করেছে সরকার।

আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের ছায়া: টিটিপি কানেকশন

বাংলাদেশের পলাতক জঙ্গিরা যে কেবল দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও যোগসূত্র স্থাপন করছে, তার অকাট্য প্রমাণ পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

গত ২৮ এপ্রিল রাতে নিষিদ্ধ উগ্রবাদী সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ঢাকা থেকে চার যুবককে আটক করা হয়। মো. ইমরান চৌধুরী, মো. মোস্তাকিম চৌধুরী, রিপন হোসেন শেখ ও আবু বক্কর নামের এই যুবকদের আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্তকারীরা জানান, তারা নিজেদের মধ্যে ‘আরসা’ পরিচয়ে যোগাযোগ করলেও মূলত টিটিপি’র সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা ছিল। ইমরানকে চীন পালানোর চেষ্টাকালে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয় এবং পরে তার দেওয়া তথ্যে কামরাঙ্গীরচরের একটি ফ্ল্যাট থেকে বাকিদের গ্রেপ্তার করা হয়।

এর আগে গত বছর গোপালগঞ্জের রতন ঢালী ও ফয়সাল হোসেন দুবাই যাওয়ার কথা বলে বেনাপোল হয়ে ভারত ও আফগানিস্তান পেরিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করে এবং টিটিপি’র হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে নিহত হয়। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জ থেকে শামীম মাহফুজ এবং সাভার থেকে আরেক ফয়সালকে টিটিপি কানেকশনের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এই সীমান্তহীন উগ্রবাদ প্রমাণ করে যে, দেশের ভেতরের পলাতক জঙ্গিরা আন্তঃদেশীয় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সহায়তায় বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে সক্ষম।

প্রশাসনের বর্তমান পদক্ষেপ ও কারাগারের ভেতরের চিত্র

পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ডিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যারা এই ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী কাজের সঙ্গে জড়িত থাকবে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

জঙ্গিবাদ দমনে কাজ করা ডিএমপি’র কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) বিভাগের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে জানান, তাদের সাইবার ইন্টেলিজেন্স টিম পলাতক জঙ্গিদের অনলাইন কার্যক্রম নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। এটি মোকাবিলা করার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।

কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন ও মিডিয়া) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ জানান, দেশের সব কারাগারে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সিসিটিভি মনিটরিং, সশস্ত্র পাহারা ও ডিউটির সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি আটক জঙ্গিদের একটি নির্দিষ্ট সুরক্ষিত জোনে (High-Risk Zone) রাখা হয়েছে। তাদের প্রতিটি গতিবিধি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং কারাগারের ভেতরে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও করণীয়

কারা বিশ্লেষক ও সাবেক ডিআইজি প্রিজন মেজর (অব.) সামছুল হায়দার সিদ্দিকী এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার তাগিদ দিয়েছেন। তার মতে, ৫ আগস্টের সুযোগ নিয়ে যে জঙ্গিরা পালিয়েছে এবং যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র লুট হয়েছে, তা একটি ভয়ংকর সমীকরণ।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, কেবল কারাগারের ভেতর নিরাপত্তা বাড়ালেই হবে না। বর্তমানে বন্দি থাকা জঙ্গিদের যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশেষ করে তারা টেলিফোনে কার সঙ্গে কথা বলছে এবং তাদের কাছে কারা দর্শনার্থী হিসেবে আসছে, তা কঠোর নজরদারির আওতায় রাখতে হবে। একইসঙ্গে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার মতো সংবেদনশীল জায়গাগুলোতে সতর্কতা বাড়াতে হবে, যাতে কোনোভাবেই জেলের ভেতর থেকে বাইরে থাকা পলাতক জঙ্গিদের কাছে কোনো বার্তা বা নির্দেশনা না পৌঁছায়।

৭০ জন দুর্ধর্ষ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি নিখোঁজ থাকা কোনো সাধারণ অপরাধীর পলাতক থাকার মতো ঘটনা নয়। এরা প্রত্যেকেই একেকটি ‘স্লিপার সেল’ হিসেবে কাজ করতে সক্ষম। মুক্ত আকাশে থাকা এই দুর্ধর্ষ মস্তিষ্কগুলো এবং তাদের হাতে থাকা লুণ্ঠিত অস্ত্র যেকোনো মুহূর্তে দেশের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আশ্বাসের পরও, সাধারণ মানুষের মনে যে আতঙ্ক দানা বেঁধেছে, তা অমূলক নয়। এই মুহূর্তে প্রয়োজন পলাতকদের ধরতে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান আরও জোরদার করা, আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময় বৃদ্ধি করা এবং সাধারণ নাগরিকদের সচেতনতা। দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এক সেকেন্ডের জন্যও শিথিল করার কোনো সুযোগ এখন আর অবশিষ্ট নেই।


এ জাতীয় আরো খবর...