একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো দাঁড়িয়ে থাকে এর দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্রের ওপর। সরকারি চাকরিতে একজন কর্মকর্তা যখন প্রবেশ করেন, তখন তিনি কেবল একটি পেশায় যোগ দেন না, বরং রাষ্ট্রের সেবায় নিজের জীবনের একটি বড় অংশ উৎসর্গ করার শপথ নেন। দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা, দেশে-বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা এবং মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের সাথে কাজ করার মাধ্যমে একজন কর্মকর্তা হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রের অমূল্য সম্পদ। পঁচিশ বছরের এই দীর্ঘ পথচলা সাধারণত একজন কর্মকর্তার জীবনে একটি বিশাল অর্জন বা মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে এই ‘পঁচিশ বছর’ শব্দটি এখন আর কোনো অর্জনের প্রতীক নয়, বরং এটি পরিণত হয়েছে এক চরম আতঙ্কের প্রতিশব্দে। সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রশাসনের অন্দরমহলে এক অজানা ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে যাদের চাকরির বয়স পঁচিশ বছর পূর্ণ হয়েছে বা হতে চলেছে, তারা প্রতিদিন অফিসে যান এই আশঙ্কায় যে, আজই হয়তো তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হবে ‘বাধ্যতামূলক অবসর’ নামক আইনি খড়্গ। মাত্র দশ দিনের ব্যবধানে ত্রিশজন উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাকে এই প্রক্রিয়ায় চাকরি থেকে বিদায় করার পর পুরো সচিবালয় থেকে শুরু করে পুলিশ সদর দপ্তর পর্যন্ত এই আতঙ্ক এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।
বাধ্যতামূলক বা অকাল অবসরের এই প্রক্রিয়ার মূল আইনি হাতিয়ার হলো ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’ (২০১৮ সালের ৫৭ নম্বর আইন)। এই আইনের ৪৫ ধারায় একটি অত্যন্ত ক্ষমতাধর এবং একইসঙ্গে বিতর্কিত বিধান রাখা হয়েছে। এই বিধান অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর চাকরির মেয়াদ পঁচিশ বছর পূর্ণ হলে সরকার চাইলে ‘জনস্বার্থে’ যে কোনো সময় তাকে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই অবসরে পাঠাতে পারে। সাধারণ আইনি প্রক্রিয়ায় কোনো কর্মকর্তা যদি দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার বা বড় ধরনের কোনো অপরাধ করেন, তবে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়, তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয় এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়। অপরাধ প্রমাণিত হলেই কেবল তাকে চাকরিচ্যুত বা বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু ৪৫ ধারার প্রয়োগ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে কোনো কৈফিয়ত তলব করা হয় না। একজন কর্মকর্তা হঠাৎ করেই একদিন জানতে পারেন যে, রাষ্ট্র আর তার সেবা নিতে ইচ্ছুক নয়। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, যে ‘জনস্বার্থের’ কথা বলে একজন কর্মকর্তাকে বিদায় করা হয়, সেই কর্মকর্তা তার পুরো চাকরিজীবনে ঠিক কী ধরনের ‘জনবিরোধী’ কাজ করেছিলেন, তা তিনি কোনোদিন জানতেও পারেন না। এটি কেবল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটায় না, বরং সামাজিকভাবেও তাকে এক ধরনের অদৃশ্য কলঙ্কের মুখে ফেলে দেয়।
সাম্প্রতিক সময়ে এই আইনের ব্যবহার এত মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে যে, অনেকেই একে প্রশাসনের ভেতরে এক ধরনের ‘রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান’ বলে আখ্যায়িত করছেন। অভিযোগ উঠেছে যে, যখনই দেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তন ঘটে, তখনই বিদায়ী সরকারের ‘অনুগত’ বা ‘সুবিধাভোগী’ হিসেবে চিহ্নিত কর্মকর্তাদের এই ধারার মাধ্যমে সরিয়ে দেওয়া হয়। এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো পদোন্নতি বঞ্চিতদের জায়গা করে দেওয়া। এক সরকারের আমলে যারা রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে বঞ্চিত থাকেন, মাসের পর মাস বা বছরের পর বছর ওএসডি (অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি) হিসেবে বা কম গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে সংযুক্ত থাকেন, সরকার বদলের পর তাদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা হয়। আর সেই শূন্যস্থান পূরণের জন্যই মূলত সদ্য বিদায়ী সরকারের আমলে ভালো পোস্টিংয়ে থাকা কর্মকর্তাদের পঁচিশ বছরের খড়্গে বলি হতে হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়াটি কি আসলেই সুবিচার নিশ্চিত করছে? এই প্রশ্নটি এখন প্রশাসনের প্রতিটি স্তরেই ধ্বনিত হচ্ছে।
অবশ্য সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এই বিষয়টিকে সম্পূর্ণ রুটিন ওয়ার্ক হিসেবেই দাবি করা হচ্ছে। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের নানামুখী প্রশ্নের সম্মুখীন হন বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বাধ্যতামূলক অবসরের কারণ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি অত্যন্ত শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলেন যে, মন্ত্রণালয়ের রুটিন কাজগুলোর মধ্যে নিয়োগ, বদলি, প্রমোশন এবং রিটায়ারমেন্ট বা অবসর প্রদান অন্যতম। এর প্রতিটি পদক্ষেপই সম্পূর্ণ আইনানুগভাবে সম্পন্ন করা হচ্ছে এবং এটি প্রশাসনের জন্য কোনো নতুন বিষয় নয়। যাদের অবসরে পাঠানো হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানান যে, এই সিদ্ধান্তগুলো হুট করে নেওয়া হয় না। ডিপার্টমেন্ট বা বিভাগীয় পর্যায়ে নিবিড় যাচাই-বাছাইয়ের পর এই সিদ্ধান্তগুলো চূড়ান্ত হয়। এটি সম্পূর্ণভাবে মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিষয়। এই পুরো প্রক্রিয়া পর্যালোচনার জন্য সুনির্দিষ্ট কমিটি কাজ করছে। তিনি স্বীকার করেন যে, অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই নানা ধরনের অভিযোগ থাকে, তবে কারো প্রতি যেন কোনো অবিচার (ইনজাস্টিস) না হয়, সেই বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় এবং সবকিছুই প্রচলিত বিধি মোতাবেক পরিচালিত হয়।
তবে ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বাধ্যতামূলক অবসরের এই সংস্কৃতি বাংলাদেশের রাজনীতি ও প্রশাসনে মোটেও নতুন কোনো চর্চা নয়। নব্বই-পরবর্তী গণতান্ত্রিক যুগে এরশাদ সরকারের পতনের পর থেকে শুরু করে প্রতিটি সরকারই এই অস্ত্রটির ব্যবহার করেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শী হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর এক অলিখিত রীতি দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলেও এই ধারা অব্যাহত ছিল। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যখন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখনও সরকারি চাকরি আইনের এই ৪৫ ধারার প্রয়োগ থেমে থাকেনি। বরং সেই সময়ে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে প্রশাসনের খোলনলচে বদলে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম এক বছরে প্রশাসন ক্যাডারের ২৯ জন শীর্ষ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন সময়ে অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদমর্যাদার আরও ৩১ জন কর্মকর্তাকে এই আইনি প্রক্রিয়ায় বিদায় করা হয়। যাদের অবসরে পাঠানো হয়েছিল, তাদের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে তারা ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনগুলোতে রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহায়তা করেছিলেন। প্রশাসন ক্যাডারের বাইরেও ওই সরকার এক প্রজ্ঞাপনেই জুডিশিয়াল সার্ভিসের ১৮ জন বিচারককে এবং বিভিন্ন সময়ে পুলিশের ৫১ জন শীর্ষ কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠিয়েছিল। এর মাধ্যমে মূলত একটি বার্তাই দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল যে, বিগত সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে যারা জনগণের ভোটাধিকার হরণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন, নতুন বাংলাদেশে তাদের কোনো স্থান নেই।
বর্তমান সরকারও সেই একই পথে হাঁটছে। এরই মধ্যে তিন দফায় পাঁচজন অতিরিক্ত আইজিপিসহ মোট ৩৫ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ গত রোববার পুলিশের ১৬ জন ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে সরকারি আইনের ৪৫ ধারায় অবসর প্রদান করে সরকার। এই ঘটনার পর থেকে প্রশাসনের অন্য ক্যাডারগুলোতেও এক ধরনের স্থবিরতা ও আতঙ্ক ভর করেছে। বিশেষ করে বিসিএস ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের মাঝে এখন চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। চলতি মাসের ২৮ তারিখে এই ব্যাচের কর্মকর্তাদের চাকরির বয়স ঠিক পঁচিশ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। আগে থেকেই এই ব্যাচের যে কর্মকর্তারা ওএসডি হিসেবে আছেন বা কম গুরুত্বপূর্ণ পদে সংযুক্ত রয়েছেন, তারা আদৌ চাকরিতে টিকতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দিহান। পাশাপাশি প্রশাসনে এই গুঞ্জনও তীব্র হয়েছে যে, ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) চাকরির বয়স পঁচিশ বছর হওয়া মাত্রই তাদের অবসরে পাঠানো হবে।
পুলিশ বিভাগের অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে জানা গেছে, বর্তমানে পুলিশের তিনজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ওএসডি হিসেবে এবং ১১৩ জন কর্মকর্তা বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত রয়েছেন। এদের মধ্যে যাদের চাকরির মেয়াদ পঁচিশ বছর পূর্ণ হয়েছে, তাদের অতীত কর্মকাণ্ড এখন আতশকাঁচের নিচে রেখে নিবিড়ভাবে যাচাই করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ মেয়াদে এই কর্মকর্তারা কোনো ধরনের অতি উৎসাহী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন কি না, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের দমনে তাদের ভূমিকা কেমন ছিল এবং বিতর্কিত নির্বাচনগুলোতে তারা কতটা নিরপেক্ষ ছিলেন—এই সবকিছুই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখা হচ্ছে। সামান্য ‘দোষ’ বা সংশ্লিষ্টতা পেলেই তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর সেই শূন্য পদগুলোতে দীর্ঘ বছর ধরে বঞ্চনার শিকার হওয়া যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও পদায়ন দিয়ে প্রশাসনের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করা হবে।
কিন্তু এই প্রক্রিয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রশাসন ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, ঢালাওভাবে বাধ্যতামূলক অবসর বা সরকারি চাকরি আইনের ৪৫ ধারার এমন যথেচ্ছ ব্যবহার ভবিষ্যৎ প্রশাসনের জন্য একটি ভয়ংকর কালো নজির তৈরি করবে। এটি সত্য যে, আগের সরকারের পক্ষে অন্ধভাবে কাজ করা এবং সরকারি চাকরির নীতিনৈতিকতা বিসর্জন দেওয়া কর্মকর্তাদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া জরুরি। কিন্তু সেই শাস্তি হতে হবে সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে, ঢালাওভাবে নয়। পুলিশ বিভাগের এই শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, যখন কোনো অত্যন্ত চৌকস ও দক্ষ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়, তখন তার একটি নেতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পুরো বাহিনীর ওপর পড়ে। তবে তিনি আইনি দিকটিও স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন যে, সরকারি চাকরি মূলত একটি চুক্তির মতো। সেই চুক্তিতেই উল্লেখ থাকে যে সরকার চাইলে একটি নির্দিষ্ট সময় পর তাকে বিদায় করতে পারে। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি সতর্ক করেন যে, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনীতিকীকরণের বৃত্ত থেকে বের করে আনতে না পারলে এই বাধ্যতামূলক অবসরের সংস্কৃতি অনন্তকাল ধরে চলতে থাকবে। যারা ক্ষমতায় আসবেন, তারা কেবল নিজেদের মতাদর্শের লোকদেরই সুযোগ দেবেন। এই চক্র ভাঙতে হলে সম্পূর্ণ নির্মোহভাবে নিয়োগ ও পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে, প্রশাসন বিশ্লেষক এবং প্রশাসনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থের প্রণেতা মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া এই ঢালাও শাস্তির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ভোটে দায়িত্ব পালনকারী যেসব ডিসিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে বা যাদের অবসরে পাঠানোর পরিকল্পনা চলছে, তা প্রশাসনের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত খারাপ নজির হয়ে থাকবে। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তারা সাধারণত তাদের কাছে থাকা সবচেয়ে যোগ্য, দক্ষ এবং মেধাবী কর্মকর্তাদেরই বাছাই করে ডিসি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে থাকে। ফলে এই ডিসিরা হলেন প্রশাসনের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। যারা সুনির্দিষ্টভাবে ডিসি পদে থেকে রাজনৈতিক কর্মীর মতো আচরণ করেছেন এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে সরাসরি ভোট কারচুপিতে অংশ নিয়েছেন, তাদের অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনতে হবে। কিন্তু ঢালাওভাবে সবাইকে শাস্তির মধ্যে নিয়ে এসে প্রশাসনে এমন আতঙ্ক তৈরি করা উচিত নয়, যা ভবিষ্যৎ সরকারের জন্যও মসৃণভাবে দেশ পরিচালনার পথ রুদ্ধ করে দেয়।
একই সুর ধ্বনিত হয়েছে সাবেক সচিব ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদারের কণ্ঠেও। তিনি মনে করেন, নির্বাচন পরিচালনাকারী কর্মকর্তাদের ঢালাওভাবে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো যৌক্তিক নয়। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, সেই নির্বাচনগুলো তো হয়েছিল তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছায়। সেখানে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা একজন ডিসি বা অন্য কোনো কর্মকর্তার পক্ষে কি সরকারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে বিদ্রোহ করার কোনো আইনি বা কাঠামোগত সুযোগ ছিল? বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করলে উত্তরটি হলো, না। সুতরাং, পরিস্থিতি বাধ্যবাধকতার কারণে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের একতরফাভাবে শাস্তি দেওয়াটা সুশাসনের লক্ষণ হতে পারে না। এতে ভবিষ্যৎ প্রশাসন ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আজকে যারা নতুন করে পদায়ন পাচ্ছেন বা বর্তমান সরকারের অধীনে কাজ করছেন, তারাও তো একদিন রাজনৈতিক পালাবদলের মুখে পড়বেন। আজকের এই ঢালাও শাস্তির নজির আগামী দিনে তাদের জন্যও বুমেরাং হয়ে ফিরে আসতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, একটি রাষ্ট্র কখনো কেবল প্রতিশোধের স্পৃহা বা রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযানের ওপর ভিত্তি করে টেকসই হতে পারে না। প্রশাসনের কর্মকর্তারা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সেবক নন, তারা রাষ্ট্রের সেবক। রাষ্ট্র তার বিপুল অর্থ ও সময় বিনিয়োগ করে একেকজন কর্মকর্তাকে তৈরি করে। পঁচিশ বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে ওঠা একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে কেবল পূর্ববর্তী সরকারের আমলে ভালো পদে থাকার অজুহাতে ছুঁড়ে ফেলাটা আখেরে রাষ্ট্রেরই অপচয়। যারা সত্যিকার অর্থেই দুর্নীতিগ্রস্ত, মানবাধিকার লঙ্ঘনে সরাসরি জড়িত এবং প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দলীয়করণ করেছেন, তাদের বিচারের আওতায় আনার জন্য প্রচলিত আইনি ব্যবস্থাই যথেষ্ট। ‘জনস্বার্থের’ দোহাই দিয়ে কারণ দর্শানোর সুযোগ না দিয়ে ৪৫ ধারার প্রয়োগ দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মেরুদণ্ডহীন করে তুলবে। কর্মকর্তারা ভবিষ্যতে কোনো স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পাবেন, তারা সব সময়ই চাইবেন রাজনৈতিক নেতাদের মন জুগিয়ে চলতে, যাতে ক্ষমতা বদল হলেও তাদের চাকরি বেঁচে থাকে। আর এমন মেরুদণ্ডহীন ও ভীতসন্ত্রস্ত আমলাতন্ত্র দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন কখনোই বাস্তবে রূপ নেবে না। তাই এখনই সময় এই ‘পঁচিশ বছর’ আতঙ্কের অবসান ঘটিয়ে একটি প্রকৃত নিরপেক্ষ, শক্তিশালী এবং জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দেওয়া। তা না হলে রাজনৈতিক পালাবদলের এই প্রতিশোধের চক্র চলতেই থাকবে, আর মাঝখান থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্র ও এর সাধারণ জনগণ।