ভূ-রাজনৈতিকভাবে বিশ্বের অন্যতম স্পর্শকাতর জলপথ হরমুজ প্রণালিতে এবার রহস্যজনকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি অত্যাধুনিক নজরদারি ড্রোন। ‘এমকিউ-৪সি ট্রাইটন’ (MQ-4C Triton) মডেলের এই ড্রোনটির বাজারমূল্য প্রায় ২৪ কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সদ্য ঘোষিত অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মাত্র দুদিনের মাথায় এই দুর্ঘটনা ঘটায় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ও নানা জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়েছে।
৫০ হাজার ফুট থেকে হঠাৎ সাগরে পতন
আন্তর্জাতিক এভিয়েশন ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ‘ফ্লাইটরাডার২৪’ (Flightradar24) এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ক মার্কিন গণমাধ্যম ‘দ্য ওয়ার জোন’ (The War Zone)-এর তথ্যমতে, গত ৯ এপ্রিল ড্রোনটি হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরের আকাশে একটি নিয়মিত নজরদারি মিশনে ছিল। প্রায় তিন ঘণ্টা সফলভাবে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের পর ড্রোনটি ইতালির সিসিলি দ্বীপে অবস্থিত ‘সিগোনেল্লা নাভাল এয়ার স্টেশন’-এ নিজস্ব ঘাঁটির দিকে ফিরছিল।
তবে মাঝপথে হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে যানটি। ট্র্যাকিং ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ড্রোনটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৫২ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই এটি অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে নিচে নামতে শুরু করে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই ১২,৭৫০ ফুটের নিচে নেমে আসে। ঠিক এই সময়েই ড্রোনটির ট্রান্সপন্ডার থেকে আন্তর্জাতিক জরুরি সংকেত বা ‘কোড ৭৭০০’ (Code 7700) পাঠানো হয়। এরপরই রাডার থেকে চিরতরে হারিয়ে যায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্যতম দামি এই সম্পদ।
কী এই এমকিউ-৪সি ট্রাইটন?
মার্কিন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নর্থরোপ গ্রুম্যান-এর তৈরি এই এমকিউ-৪সি ট্রাইটন সাধারণ কোনো ড্রোন নয়। মার্কিন সামরিক বাহিনীতে একে বলা হয় ‘সাগরের ওপর ভাসমান চোখ’ বা ‘ডানাযুক্ত উপগ্রহ’ (Satellite with wings)। এর কিছু চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য হলো:
আকাশচুম্বী মূল্য: ড্রোনটির প্রতিটি ইউনিটের দাম ২৩ কোটি ৮১ লাখ থেকে ২৪ কোটি ডলারের বেশি। মার্কিন নৌবাহিনীর বহরে এ ধরনের ড্রোনের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত।
অটুট নজরদারি: এটি একটানা ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আকাশে উড়তে সক্ষম এবং হাই-রেজোলিউশন সেন্সর ও রাডার ব্যবহার করে বিশাল সমুদ্র এলাকার নিখুঁত ছবি ও তথ্য পাঠাতে পারে।
অপারেশনাল সক্ষমতা: ৫০ হাজার ফুটের বেশি উচ্চতায় থেকে শত্রুপক্ষের চোখ এড়িয়ে নজরদারি চালানোর জন্য এটি বিশেষভাবে তৈরি।
‘ক্লাস এ মিসহ্যাপ’ ও মার্কিন নৌবাহিনীর অবস্থান
মার্কিন নাভাল সেফটি কমান্ড তাদের এক বিবৃতিতে এই দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। তারা এই ঘটনাকে সামরিক পরিভাষায় ‘ক্লাস এ মিসহ্যাপ’ (Class A Mishap) হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীতে কোনো দুর্ঘটনায় যদি অন্তত ২০ লাখ ডলারের বেশি আর্থিক ক্ষতি হয় অথবা কোনো প্রাণহানি ঘটে, তবে তাকে ‘ক্লাস এ মিসহ্যাপ’ বলা হয়।
তবে ড্রোনের সিরিয়াল নম্বর (১৬৯৮০৪) নিশ্চিত করা হলেও ড্রোনটি ঠিক কোথায় বিধ্বস্ত হয়েছে, তা ‘অপারেশনাল সিকিউরিটি’ বা কৌশলগত নিরাপত্তার স্বার্থে গোপন রাখা হয়েছে। ড্রোনটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নিজে থেকেই সাগরে আছড়ে পড়েছে, নাকি ইরান বা অন্য কোনো শত্রুপক্ষের সাইবার হামলা, জ্যামিং বা সরাসরি মিসাইলের আঘাতে বিধ্বস্ত হয়েছে—সে বিষয়েও নৌবাহিনীর বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে কিছু বলা হয়নি।
ধ্বংসাবশেষ নিয়ে নতুন শঙ্কা ও তিন তত্ত্ব
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা ড্রোনের এই রহস্যময় অন্তর্ধানের পেছনে মূলত তিনটি সম্ভাব্য তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করছেন:
১. ভয়াবহ যান্ত্রিক ত্রুটি: ফেরার পথে ড্রোনের মূল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় কোনো বড় ধরনের কারিগরি গোলযোগ দেখা দিতে পারে, যার ফলে এটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সাগরে আছড়ে পড়েছে।
২. ইলেকট্রনিক ওয়্যারফেয়ার (EW): পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে শক্তিশালী ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। ড্রোনের যোগাযোগ ব্যবস্থা হ্যাক হওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
৩. শত্রুর আঘাত: যুদ্ধবিরতি চললেও কোনো বিচ্ছিন্ন পক্ষ একে সরাসরি ভূপাতিত করে থাকতে পারে।
বর্তমানে মার্কিন নৌবাহিনীর সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হলো ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ। এই ড্রোনে থাকা অত্যন্ত সংবেদনশীল রাডার ও সেন্সর প্রযুক্তি যদি অন্য কোনো প্রতিপক্ষের হাতে পড়ে যায়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক গোপনীয়তার জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারে মার্কিন নৌবাহিনী গোপন তৎপরতা চালাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুদ্ধবিরতির মাঝেই নতুন উত্তেজনার পারদ
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয় এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজার কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল। কিন্তু সেই চুক্তির রেশ কাটতে না কাটতেই এমন একটি স্পর্শকাতর এলাকায় আমেরিকার এত দামি নজরদারি ড্রোনের সলিল সমাধি পরিস্থিতিকে ফের ঘোলাটে করে তুলেছে। এটি নিছকই দুর্ঘটনা নাকি উত্তেজনার নতুন কোনো সূচনা, সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে আন্তর্জাতিক মহল।