বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৩ অপরাহ্ন

রাষ্ট্রীয় মদদে পৈশাচিকতা: ইসরায়েলি বন্দিশিবিরের ভয়াবহ রূপ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২০ বার
প্রকাশ: বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬

ইসরায়েলি কারাগারগুলোতে আটক ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর অমানবিক ও বীভৎস নির্যাতনের যে চিত্র বেরিয়ে আসছে, তা চরম মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, ইসরায়েলি সামরিক ও বিচার বিভাগের ছত্রছায়ায় ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর যৌন নির্যাতন এখন দখলদার রাষ্ট্রটির একটি “সংগঠিত রাষ্ট্রীয় নীতিতে” পরিণত হয়েছে।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর হাতে আসা ‘ইউরো-মেডিটেরিয়ান হিউম্যান রাইটস মনিটর’ (Euro-Med Monitor)-এর এক এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন শিউরে ওঠার মতো সব সাক্ষ্য। এই প্রতিবেদনের পাশাপাশি জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বি’সলেম (B’Tselem)-এর বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে কারাগারগুলোর ভেতরের নারকীয় অবস্থা উন্মোচিত হয়েছে।

‘সদে তেইমান’ বা কুখ্যাত টর্চার ক্যাম্পের ভয়াবহতা

ইউরো-মেড মনিটর তাদের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনের নাম দিয়েছে ‘দেয়ালের আড়ালে আরেক গণহত্যা’ (Another Genocide Behind Walls)। সংস্থাটি ফিলিস্তিনি প্রাক্তন বন্দীদের কাছ থেকে যেসব সাক্ষ্য সংগ্রহ করেছে, তা মূলত ইসরায়েলের ‘সদে তেইমান’ (Sde Teiman) বন্দিশিবিরকে কেন্দ্র করে। এই শিবিরটিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এখন ‘ডি-ফ্যাক্টো টর্চার ক্যাম্প’ বা অঘোষিত নির্যাতন কেন্দ্র হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে।

প্রতিবেদনে উঠে আসা কয়েকটি ভয়াবহ সাক্ষ্য নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ভিডিও ধারণ ও ব্ল্যাকমেইল: উত্তর গাজার ৪২ বছর বয়সী এক নারী প্রাক্তন বন্দী জানান, সদে তেইমান কেন্দ্রে তাকে নগ্ন করে একটি ধাতব টেবিলের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। সেখানে দুই দিন ধরে মুখোশধারী ইসরায়েলি সৈন্যরা তার ওপর পাশবিক নির্যাতন ও ধর্ষণ চালায়। হাতকড়া পরা ও রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে সারা রাত ফেলে রাখার পর পরদিন আবারও নির্যাতন করা হয়। তিনি জানান, পুরো এই নৃশংসতার ভিডিও ধারণ করেছিল সৈন্যরা। পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাকে কব্জি দিয়ে ঝুলিয়ে রেখে সেই ভিডিওগুলো দেখানো হয় এবং ব্ল্যাকমেইল করে বলা হয়—সহযোগিতা না করলে এগুলো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

  • প্রশিক্ষিত কুকুর লেলিয়ে দেওয়া: সদে তেইমানে আটক ৩৫ বছর বয়সী আমির নামের আরেক ফিলিস্তিনি ব্যক্তি জানান, সৈন্যরা তাকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হতে বাধ্য করে। এরপর সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে তার গায়ে প্রস্রাব করানো হয় এবং পাশবিক কায়দায় তাকে ধর্ষণ করানো হয়। আমির তার বর্ণনায় বলেন, “কুকুরটি প্রশিক্ষিত উপায়ে আমার মলদ্বারে প্রবেশ করেছিল এবং এটি বেশ কয়েক মিনিট ধরে চলেছিল। আমি গভীরভাবে অপমানিত বোধ করেছি।”

  • অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ব্যবহার: ‘কমিশন অব ডিটেইনিস অ্যান্ড এক্স-ডিটেইনিস অ্যাফেয়ার্স’-এর আইনজীবী খালেদ মাহাজনা তার বর্ণনায় জানিয়েছেন, সদে তেইমানের এক সৈন্য একজন বন্দীর মলদ্বারে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের নজেল ঢুকিয়ে এর ভেতরের উপাদানগুলো স্প্রে করে দেয়। এর ফলে ওই বন্দীর অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তিনি চরম যন্ত্রণায় ভোগেন।

অন্যান্য আন্তর্জাতিক মাধ্যমের অনুসন্ধান ও রাষ্ট্রীয় দায়মুক্তি

শুধুমাত্র ইউরো-মেড মনিটরই নয়, গত কয়েক মাসে আন্তর্জাতিক আরও বেশ কয়েকটি সংস্থা ইসরায়েলি কারাগারে এই পদ্ধতিগত নির্যাতনের প্রমাণ পেয়েছে:

  • জাতিসংঘ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট: জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ৭ অক্টোবরের পর থেকে ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের মাত্রা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। বন্দীদের ইলেকট্রিক শক দেওয়া, প্রচণ্ড ঠান্ডায় নগ্ন করে রাখা, এবং ক্রমাগত মারধরের বিষয়টি এখন সাধারণ ঘটনা।

  • বি’সলেম-এর পর্যবেক্ষণ: ইসরায়েলি মানবাধিকার গোষ্ঠী বি’সলেম জানিয়েছে, ইসরায়েলের ডজনখানেক বেসামরিক ও সামরিক কারাগারকে রাতারাতি পরিকল্পিতভাবে “নির্যাতন শিবিরে” রূপান্তরিত করা হয়েছে।

  • কাঠামোগত দায়মুক্তি (Structural Immunity): ইউরো-মেড মনিটর এবং ফিলিস্তিনি মানবাধিকার কেন্দ্র (PCHR) জানিয়েছে, সদে তেইমান কারাগারে এক ফিলিস্তিনি বন্দীকে সঙ্ঘবদ্ধ ধর্ষণের ভিডিও ফাঁস হওয়ার পর পাঁচজন ইসরায়েলি সৈন্যকে সাময়িক আটক করা হলেও পরে তাদের ওপর থেকে অভিযোগ তুলে নেওয়া হয়। এটি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয়ভাবেই অপরাধীদের দায়মুক্তি দেওয়া হচ্ছে এবং নির্যাতনের প্রতি রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের প্রচ্ছন্ন সমর্থন রয়েছে।


এ জাতীয় আরো খবর...