২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে বিধ্বস্ত অবস্থায় থাকা আওয়ামী লীগ কি ফের রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছে? পর্দার আড়ালে কি বিএনপি-আওয়ামী লীগ কোনো গোপন সমঝোতা হয়েছে? রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন—আগামী ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের আগেই কি আওয়ামী লীগ নেতারা গণহারে দেশে ফিরছেন?
সাম্প্রতিক নানা ঘটনাপ্রবাহ এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনটি নিচে তুলে ধরা হলো:
গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এবং সাম্প্রতিক একটি ভার্চুয়াল সভায় শেখ হাসিনা বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, জেলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকলেও ২৬ মার্চের আগেই তাদের দেশে ফিরতে হবে। যারা এই আইনি লড়াই মোকাবিলা করতে অনিচ্ছুক, তাদের দল থেকে বহিষ্কারের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।
কৌশলগত প্রত্যাবর্তন:
শেখ হাসিনা ২০২৬ সালের শেষ দিকে বা ২০২৭ সালের শুরুতে দেশে ফিরবেন, তাকে গ্রেফতার করা হবে, কিন্তু তিনি নিজের বাড়িতেই কারাবন্দি থাকবেন। যেমনটি বেগম খালেদা জিয়াও সাজাপ্রাপ্ত হয়ে নিজের বাড়িতেই ছিলেন। বলা হচ্ছে এটি বিএনপির কৌশল যাতে জামায়াতে ইসলামের মতো কট্টরপন্থী দলের বদলে শেখ হাসিনাকে প্রতিপক্ষ হিসেবে রাখা যায়। জামায়াত যতই সংসদে বিরোধী দল হোক না কেন, আওয়ামী লীগ ভিড়লে আওয়ামী লীগই হবে প্রধান বিরোধী দল। যেমনটি জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ বিরোধী দলীয় নেতৃত্বে থাকলেও রাজনীতিতে বিরোধী দলীয় নেতৃত্বে সম্মান পেয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া।
সামাজিক মাধ্যমে বলা হচ্ছে শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে দিল্লিতে বৈঠক করে ফিরে আসার পরিকল্পনা করেছেন এবং দলীয় কর্মীদের মানসিক প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। গ্রেফতার এবং জেলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও নেতা কর্মীদের দেশে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তিনি নিজেও দেশে ফিরে কারাবরণ করবেন। তবে শেখ হাসিনার নিজে ফেরার আগে নেতা কর্মীদের দেশে ফেরত পাঠিয়ে পরীক্ষা করবেন পরিস্থিতি আসলেই দেশে ফেরার উপযোগী আছে কিনা।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পনেরো বছরের শাসনের অবসান ঘটে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি যুগান্তকারী ঘটনা। হাসিনার পতনের পর ডক্টর ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। ডক্টর ইউনুস দায়িত্ব নেবার পর সন্ত্রাস বিরোধী আইনে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এছাড়া ভ্রাতৃপ্রতিম এবং সহযোগী সংগঠন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর নির্বাচন কমিশনও আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে দেয়।
ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা আগামী ছাব্বিশে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে দেশে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। বর্তমানে আত্মগোপনে থাকা অনেক নেতা দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। তারা দাবি করছেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে তারা আইনের সম্মুখীন হতে প্রস্তুত। সাবেক মন্ত্রীদের অনেকেই বলছেন, এখন দেশে ফিরলে তাদের সবাইকেই গ্রেফতার করা হবে এবং জেলে পাঠানো হবে। তার পরেও তারা দেশে ফিরতে চান। কারণ আপা কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন, অবশ্যই দেশে ফিরতে হবে। তবে দেশে ফিরলেও রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানো এখনই হয়তো সম্ভব হবে না। কারণ আইনের দৃষ্টিতে আওয়ামী লীগ এখনো নিষিদ্ধ। বিএনপি সরকার নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম চালু করবে বলে মনে হয় না। এজন্য আওয়ামী লীগকে আদালতে যেতে হবে। আদালত যদি রায় দেয় তাহলেই হয়তো রাজনীতিতে ফিরতে পারবে আওয়ামী লীগ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামীর ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা করতেই বিএনপি আওয়ামী লীগকে একটি নিয়ন্ত্রিত পরিসরে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ দিচ্ছে।
সংসদীয় সমীকরণ: জামায়াত সংসদে বিরোধী দল হিসেবে শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও বিএনপি চায় রাজপথে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ হোক আওয়ামী লীগ।
খালেদা জিয়া মডেল: গুঞ্জন রয়েছে, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার মতো নিজস্ব বাসভবনে কারাবন্দি রাখা হতে পারে। এটি মূলত একটি রাজনৈতিক ভারসাম্য তৈরির কৌশল।
দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের প্রভাব বজায় রাখতে ভারত এখন তারেক রহমানের সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে আগ্রহী। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইতিমধ্যেই তারেক রহমানের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছেন।
ভারতের অস্বস্তি: ভারতে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগ নেতাদের কারণে বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী জনমত তৈরি হয়েছে। তাই ভারত চাইছে শেখ হাসিনা ছাড়া বাকি সব নেতাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে, যাতে ঢাকার সঙ্গে দিল্লির দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বাধা দূর হয়।

শেখ হাসিনার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডাদেশ। ২০২৫ সালের নভেম্বরে তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এই দণ্ড দেওয়া হয়। পলাতক থাকায় আপিলের সুযোগ না থাকলেও, মাওলানা আবুল কালাম আজাদের (বাচ্চু রাজাকার) নজির ব্যবহার করে তাঁর আইনজীবীরা এখন আপিলের পথ খুঁজছেন। আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, দেশে আইনের শাসন থাকলে তারা যেকোনো বিচার মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।
দেশের কয়েকটি জেলায় ইতিমধ্যেই বিএনপি নেতাদের উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও উত্তোলিত হয়েছে দলীয় ও জাতীয় পতাকা। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরপরই এই পরিবর্তনগুলো দৃশ্যমান হতে শুরু করে।
এখন পর্যন্ত রাজনীতির যে সমীকরণ তাতে ভারত চায় আওয়ামী লীগ ফিরুক। অন্যদিকে বিএনপি চায় জামায়াতকে ঠেকাতে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীমূলক রাজনীতির জন্য আন্তর্জাতিক চাপ আছে। এই তিন প্রয়োজনেই আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে পুনর্বাসিত হবে। তবে রাজনীতিতে ফিরলেও এখনই ক্ষমতায় ফিরছে না আওয়ামী লীগ, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। বিশেষজ্ঞরা অনেকে মনে করেন ২০৩৫ সালের আগে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখা হয়তো সম্ভব হবে না। তবে অন্তর্বর্তীমূলক রাজনীতির প্রয়োজনেই আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনও ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।
আওয়ামী লীগ ফিরলেও তাদের সামনে আইনি ও রাজনৈতিক পাহাড়সম বাধা রয়েছে। নির্বাহী আদেশে দলটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠবে কি না, তা নিয়ে এখনো সংশয় আছে। তবে ২৬ মার্চকে কেন্দ্র করে যে ডামাডোল শুরু হয়েছে, তা আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।